অলীক - শাঁওলি দে

অলীক – শাঁওলি দে

EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে অলীক – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো – 

অলীক – শাঁওলি দে

 

(১)

কথাটা কি আদৌ বলেছিল সৌম্য? নাকি এটা ওর স্বপ্ন? এটা কোনো রোগ নয় তো? বিষয়টা ধরতেই পারছে না ও!
এই তো গত মাসের ঘটনা। অফিস থেকে ফিরে সুরভিকে বলেছিল, সকালে যে পাঁচ হাজার টাকাটা রাখতে দিলাম সেটা দাও তো! সুরভির তো তখন ভিমরি খাওয়ার মতো অবস্থা। পাঁচ হাজার টাকা? কোথায়? তুমি তো আমাকে দাওনি?
সৌম্য স্পষ্টতই অবাক হয়, ওর পরিস্কার মনে আছে অফিসে বেরোবার মুখে ঠিক ফ্রিজটার সামনে দাঁড়িয়েই ও সুরভিকে টাকাটা দিয়েছিল। তবে কি এতগুলো টাকা সুরভি পুরো ঝেঁপে দিল? সে সুরভির ও অভ্যাস যে একেবারেই নেই একথা হলফ করে বলা যায় না! তবে পাঁচ হাজার টাকাটা একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না?
বেশি ঘাঁটাতে যায় না ও সুরভিকে। গতবার পুরো এক সপ্তাহ কথা বন্ধ রেখেছিল ও এমনই কোনো এক বিষয়ে। মাত্র দুজনের সংসারে একজন কথা বন্ধ করে রাখলে থাকাই মুশকিল। কিন্তু এমন ঘটনা পরপর ঘটতে থাকলে তো খুবই সমস্যার কথা।
কিন্তু সৌম্যর ভুল ভাঙতে বেশিদিন লাগল না। সুরভি টাকাটা নেয়নি, কারণ টাকাটা ও অফিস থেকে আনেইনি সেদিন। ফাইল পরিস্কার করতে গিয়ে নিজেরই ড্রয়ারে পাঁচ হাজার টাকার বাণ্ডিলটা খুঁজে পায় সৌম্য, অথচ এই ঘটনাটা ওর মনেই নেই, বরং মনের মধ্যে জ্বলজ্বল করছে ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে সুরভিকে টাকা দিচ্ছে এমন একটা দৃশ্য।
তারপর তো আরেক কাণ্ড! দুপুরে সুরভিকে ফোন করে ও অফিস থেকে প্রতিদিন। সেদিনও করেছিল। ফোন করেই বলল, আর ক’দিন থাকবে বাবার বাড়ি? কাল কি গিয়ে নিয়ে আসব?
সুরভির তো আকাশ থেকে পড়ার দশা! গত ছয়মাস ও বাবার ওখানে গিয়ে থাকেনি। আর এবার থাকা তো দূর যায়ই তো নি। বাড়িতেই আলমারি পরিস্কার করছিল ও। কয়েক মুহূর্ত থমকে বলেছিল, কী বলছ আবোলতাবোল? বাবার ওখানে কখন গেলাম? বাড়িতেই তো আছি!
সৌম্য অবাক হয়! বাড়িতেই আছে সুরভি? তবে যে ও পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে গতকাল অফিস যাওয়ার আগে নিজেই গাড়ি করে ও বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছে সুরভিকে! এসব কী হচ্ছে ওর সঙ্গে? আচ্ছা! এটা কি কোনো রোগ? দিশা পায় না সৌম্য।

(২)

জানালা দিয়ে যেটুকু আকাশ দেখা যায় সেটুকুর দিকেই একমনে তাকিয়ে আছে সৌম্য। রোগ বা মনের ভুলটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গিয়েছে। সুরভি ডাক্তার ডাক্তার করে মাথাটা খারাপ করে ফেলল। তবে কি ওর সত্যি সত্যিই মাথা খারাপ হল? ভয়ে, আতঙ্কে বুক শুকিয়ে আসে ওর।
এই ভয়টা কিন্তু সৌম্যর আজকের নয়! পারিবারিক ইতিহাস জড়িয়ে আছে এতে। ওর বাবা, ওর ঠাকুরদা দুজনেই বয়সের শেষ প্রান্তে এসে এই রোগের শিকার হয়েছিলেন। ঠাকুরদার পর বাবাও যখন মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেন সকলে বলত, হেরিডিটি, হেরিডিটি! নইলে ছেলেও কেন বাবার মতো হবে? আর ঠিক এই কথাটাই মনের মধ্যে ওর গেঁথে গিয়েছিল সেই ছোটবেলা থেকে। হেরিডিটি, বাবার মতো ছেলে এই শব্দগুলো কিছুতেই পিছু ছাড়েনি ওর। কত কত রাত স্বপ্নে এইসব শব্দ শুনে আতঙ্কে কেঁপে উঠেছে ও! আজ এসবই কি ওর জীবনে সত্যি হল?
সুরভি বলছে, বাড়াবাড়ি কিছু হওয়ার আগে চলো একবার অন্তত কাউন্সিলিং করিয়ে আনি! কিন্তু সৌম্য রাজি হয় না! যে রোগ জন্মসূত্রে জড়িয়ে গেছে ওর জীবনের সঙ্গে তা সারাবে এমন ডাক্তার আছে আদৌ? জন্মদাগ মোছা যায় কখনো?
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হতাশ লাগে ওর। কিছুই পাওয়া হল না জীবনে। না মনের মতো চাকরি হল, না সুরভিকে কোনো সন্তান দিতে পারল। তাও ভালো মেয়েটা এখনও ওর কাছে আছে, চলে যায়নি ওর হাত ছেড়ে।
অন্যমনস্ক হয়েই সুরভিকে ডাক দেয় সৌম্য। মেঘ করেছে, মনে হচ্ছে এখনই ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামবে। কফি কাপ হাতে নিয়ে সৌম্যের সামনে দাঁড়ায় সুরভি। মুখে হাসি, ফুল ছাপের একটা নাইটি পরে আছে ও। আলুথালু অথচ কত ভালো লাগছে ওকে আজ! বাবানটার জন্যই হয়ত সুরভির সৌন্দর্য এত বেড়েছে, সৌম্য ভাবে। সন্তান না হলে কি নারীরা পূর্ণতা পায়? সুরভির দিকে তাকিয়ে সৌম্য বলে, বাবান ঘুমালো? দুধ খেয়েছে?
সুরভি এখন আর অবাক হয় না। গত কয়েকদিন থেকে সৌম্য মাঝেমধ্যেই কল্পনায় বাবান নামে এক সন্তান নিয়ে আসছে। কত গল্প যে করছে ওকে নিয়ে তার শেষ নেই। সুরভি দেখেছে ওই সময়গুলোয় সৌম্যর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ওকে সন্তান দিতে না পারার যে যন্ত্রনা সৌম্যকে সবসময় কুঁড়ে কুঁড়ে খায়, তা এইসময়টাতে অদ্ভুতভাবে উধাও হয়ে যায়। অল্প সময়ের জন্য হলেও ও মুক্তি পায় সব যন্ত্রনা থেকে!
সুরভি সৌম্যকে আর ভুল ধরিয়ে দেয় না। সৌম্য বাবানকে নিয়ে গল্প করতে থাকে। সুরভি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সৌম্যের দিকে। এই কয়েক মুহূর্তের সুখ কি সারাজীবনের দুঃখ পাওয়ার থেকে দামী নয়?
সুরভি ঘরের ভেতরে গিয়ে মোবাইল থেকে ডাক্তারের নম্বরটা ডিলিট করে দেয়। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। সুরভির মনের মধ্যেও কালো মেঘ জমেছে অনেকদিন হল। কিন্তু ও জানে এই মেঘ থেকে বৃষ্টি হবে না। মেঘ করে এলেও ওর জীবনের খরা কোনোদিন শেষ হবে না। অন্তত সৌম্যের জীবনে তো বৃষ্টি থাকুক, অল্প কিছু মুহূর্তের জন্য হলেও সৌম্য ভিজে যাক অলীক সুখে।
আচ্ছা? সুরভির এটা কি খুব বেশি কিছু চাওয়া? এই কল্পলোক…?

অলীক - শাঁওলি দে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top