মা – মা গন্ধ – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে মা – মা গন্ধ – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো –
মা – মা গন্ধ – শাঁওলি দে :
(১)
ঘুলঘুলির ভেতর দিয়ে ঠিক যতটুকু রোদ্দুর আসা সম্ভব এ ঘরটিতে ঠিক ততখানিই আলো। কেমন একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ।বহুদিন খোলা হয়নি।ইতিউতি জড়িয়ে থাকা মাকড়শার জাল চোখে মুখে আটকে যাচ্ছে বারবার।বুকুন মেঝেতে বসা। হাতে একটা বহু পুরোনো ব্যাগ,চেন ছেঁড়া।সন্তর্পণে ব্যাগটার ভিতর হাত ঢোকাল ও।এদিক ওদিক হাতটা ঘোরাতেই জিনিসটা পাওয়া গেল।এখনো সেই একই রকম ঠান্ডা।একটা পুরোনো পারফিউমের শিশি।ওটাকে বের করে একেবারে নাকের কাছটাতে নিয়ে আসল বুকুন।আহঃ!কী শান্তি!এই সেই গন্ধ যা ওকে সেই ছোটবেলার থেকে তাড়া করে বেড়ায়।বুকুনের চোখ দু’টো হঠাৎই ভিজে ভিজে লাগল।
‘বুকুন খেতে এসো’, মায়ের ডাক শুনেই তটস্থ হয়ে গেল সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া বছর সতেরো’র মৈনাক।পারফিউমের শিশিটা তাড়াতাড়ি পকেটে চালান করে দিয়ে আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ও। চিলেকোঠার এই ঘরটাতে যায় না কেউই।বুকুনও না।যদিও বুকুন বাড়িতেই বা থাকে ক’দিন।সেই ক্লাস ফোর থেকেই সে কালিংপঙের একটা বোর্ডিং স্কুলের ছাত্র। ছুটিতে বাড়ি এলে এদিক ওদিক যেতে যেতেই সময় পার হয়ে যায়।তবে প্রত্যেকবারই যাওয়ার দিন একবার ও এই ঘরটার সামনে যায়।আলতো করে দরজায় হাত দেয় আর খুব আস্তে আস্তে ডাকতে থাকে ‘মা ,মা ,মা’।
(২)
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর বেশ কিছুদিন ছুটি পাওয়া গেছে। বুকুনের হোস্টেলেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। বাবা-মায়ের আগ্রহে বাড়িতে ফিরতেই হল।বাবা গত জন্মদিনে দামি মোবাইল গিফট করেছেন।হোস্টেলে ওটা মেট্রোনের কাছে জমা থাকে।শুধু বিশেষ প্রয়োজনে আর ছুটির দিনগুলোতেই ব্যবহার করার সুযোগ মেলে।বাড়িতে এসে ক’দিন চুটিয়ে ‘গেম’ খেলার সুযোগ পাওয়া গেল।
এখানে তেমন বন্ধু-বান্ধব নেই ওর।শুধু বাবা, মায়ের কলিগের ছেলেমেয়েরা।তাও তাদের সঙ্গে কোনো পার্টি থাকলেই দেখা হয়।সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া বুকুনের সময় কাটতে চায় না। বাবা, মা দুজনেই ব্যস্ত।গোটা বাড়িটা খাঁ খাঁ করে।অলস দুপুরগুলোতে ভীষণ মন কেমন করে ওর।চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে কখনো কখনো।বালিশ ভিজে ওঠে।ঐ ভেজা বালিশ আঁকড়েই কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে বুকুন, বুঝতেও পারে না। ছুটির দিনেও একই অবস্থা!একটাই তফাৎ,ওইদিন বাবা, মা দু’জনেই সকালবেলা বাড়ি থাকে।অবশ্য তাতে যে অবস্থার কিছুমাত্র পরিবর্তন হয় তা কিন্তু নয় ! তবু বাড়িতে লোক তো থাকে, এটাই যা স্বান্তনা।মাঝেমধ্যে মায়ের গলা শোনা যায় ‘বুকুন এটা কোরো না’ বা ‘বুকুন এদিকে এসো’।
ব্যস এই পর্যন্তই।বুকুন মা’কে বেশ ভয় পায়।মা না বলে অবশ্য মাসি বলাটাই ঠিক হত, কিন্তু বাবার ভয়ে মাসিকে মা-ই বলে ও। মাসি একদম মায়ের মতো নয়। মা কত আদর করত, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিত, খাইয়ে দিত আর সারাদিন বাড়িতে থাকত।মা খুব সুন্দর রান্নাও করত, সেই স্বাদ আজও মুখের ভেতর অনুভব করে ও। এসব কিছু স্পষ্ট মনে আছে বুকুনের। বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে আগুনের মত।বিশেষ করে শেষের সেই দিনটা।
(৩)
চিলেকোঠার ঘরটা বন্ধ করে বাইরে এল বুকুন।মা খেতে ডাকছেন।এখুনি না গেলে হাজার কথা শুনতে হবে, সঙ্গ দেবেন বাবা।যেন এই পৃথিবীতে সবচাইতে বখে যাওয়া ছেলেটা ও।বুকুন কিচ্ছু বলে না, ও বলতেই পারে না। যেমন করে কিছুই বলতে পারত না ওর মা! বাবা হুটহাট মাসিকে নিয়ে বেরিয়ে যেত এখানে সেখানে। মা কিচ্ছু জানতে চাইত না।কোন কোন দিন অনেক রাতে যদি ওর ঘুম ভেঙে যেত শুনতে পেত মা কাঁদছে আর বাবা বকে যাচ্ছেন সমানে।ছোট্ট বুকুন চোখ বুজে পড়ে থাকত। কেন যে বাবা মাকে এত বকত কে জানে ? অবশ্য পরদিন সকালে মাকে দেখলে বোঝাই যেত না কিছু হয়েছে।আজও চোখ বুজলে মায়ের বড় লাল টিপ পরা মুখটা ভেসে ওঠে।কী সুন্দর,পবিত্র সেই মুখ! এবাড়িতে মা’য়ের কোনো ছবি নেই, বুকুন ওর মনের কুঠুরিতে একটা ছবি রেখে দিয়েছে সযত্নে।তার সঙ্গে ওর যত গল্প।ছবিটাকে নিয়ে ও ইচ্ছেমত নাড়াচাড়া করে, সাজায়, আদর করে। ওর মনের হদিশ কেউ পায়না। এতটুকুই বুকুনের জীবন, এতটুকুই ওর ব্যক্তিগত।
(৪)
ছাদ থেকে তাড়াতাড়ি নামতে নামতে মায়ের সঙ্গে কাটানো সেই অল্প কিছুদিনের কথাই ভাবছিল বুকুন।ডাইনিং-এ আসতেই দেখতে পেল বাবা-মা ওর অপেক্ষাই করছেন।’কী ব্যাপার তোমায় এত ডাকতে হয় কেন ?’ বাবা বলে ওঠেন ‘হোস্টেলে থেকেও কোনো ডিসিপ্লিন শিখলে না!’ মাসিও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘এত টাকা খরচ হচ্ছে তোমার পেছনে এটা মনে রেখো। উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্টটা যেন ভালো হয়!’ দায়সারাভাবে নিচু মাথাটা ঝাঁকালো ও। মাসি বলেই চলছেন, ‘একদম মাথা নিচু করবে না।তাকাও আমার দিকে…রেজাল্ট ভালো করতেই হবে, নইলে তোমার বাবা আর আমার অফিসে প্রেস্টিজ থাকবে না, বুঝলে ? এই যে এত টাকা খরচ হচ্ছে তা কিন্তু তোমার মায়ের মতো গেঁয়োভুত বানানোর জন্য নয়। এবার বুকুন আর মাথা নিচু করে থাকতে পারল না।সরাসরি তাকালো ওর সৎ মায়ের দিকে। না সেই চোখে ভয় ছিল না কোনো, বরং আগুন ঝরছিল ওর দু’টো চোখ দিয়ে। ঠিকমতো খেতেও পারছিল না ও।গলার কাছটা কীরকম ব্যথা ব্যথা করছে, চোখ দু’টো জ্বালা জ্বালা। কোনোরকম ভীষণ অপছন্দের খাবারগুলো গিলতে লাগল ও।যতক্ষণ খাওয়া পর্ব চলল বাবা মা-ও বুকুনের অনাগত ভবিষ্যতের কথা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করে গেল। তাতে অবশ্য কতটা চিন্তা আর কতটা ‘প্রেস্টিজ’ জড়িয়ে ছিল সে বিষয়ে বুকুনের যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই গেল।বুকুন এখনো কিছুই বলতে পারল না।
(৫)
নিজের ঘরে ঢুকেই মনখারাপটা আবার জাঁকিয়ে বসল।হোস্টেলে ফিরতে এখনো একমাস।ততদিন এখানে কাটানো মুশকিল।অন্য কোনো উপায়ও ওর জানা নেই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আগাথা ক্রিস্টি’র বইটা পড়তে শুরু করল।আর ওমনি পকেটে হাতটা ঠেকে গেল।সেই পারফিউমটা!পকেট থেকে বের করে বুকে জড়িয়ে ধরল ও।আর তখনি একরাশ কান্না না জানি কোথা থেকে এসে বুকুনকে ছুঁয়ে দিল।সশব্দে কেঁদে উঠল ছেলেটি।মা চলে যাওয়ার পর এই প্রথমবার।
নাহ্,সেদিনও সে এভাবে কাঁদতে পারেনি।সারা সন্ধ্যে মায়ের দেখা না পেয়ে ছাদে চলে গিয়েছিল ও।চিলেকোঠার ঘরের দরজাটার কাছে যেতেই পা আটকে গিয়েছিল ওর।ওইটুকু বয়সে কী বুঝেছিল কে জানে, বন্ধ দরজাটায় ওর ছোট ছোট হাত দিয়ে শব্দ করেছিল আর ডাকছিল ‘মা মা মা’। তারপর বাবা এল, কাকু এল, দরজা ভাঙা হল সব লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছে ক্লাস ফোরে ওঠা মায়ের আদরের পুচকে ছেলেটা।দূর থেকে দেখেছিল মায়ের পা দু’টো শূণ্যে ঝুলছে।সেদিনই প্রথম ‘ফাঁসি’ শব্দটা শোনে ও।
মায়ের সঙ্গে একটাও কথা বলেনি ঐদিন বুকুন।অনেক ভিড় ঠেলে সবাই যখন মাকে সাজিয়ে কোথায় যেন নিয়ে চলে গিয়েছিল, না বুকুন কিচ্ছু বলেনি। শুধু মায়ের শরীর থেকে বের হওয়া গন্ধটা বুক ভরে নিয়েছিল ও।মা চলে যাবার পরই মাসি মায়ের সব জিনিসপত্র চিলেকোঠার ঘরটাতে পাঠিয়ে দিয়েছিল লোক দিয়ে।বুকুন দেখেছিল একটা পুরোনো ব্যাগে প্রিয় পারফিউমের শিশিটাও ঢুকিয়ে দিল লোকটা।বুকুন আর ওর খোঁজ পায়নি।
আজ এত বছর পর সেই শিশিটা পেয়ে বাচ্চা ছেলের মতই জড়িয়ে ধরল আঠারোতে পা দিতে চলা মৈনাক চ্যাটার্জী।পাগলের মতো আদর করতে লাগল নিষ্প্রাণ শিশিটাকে।আর তখনই টের পেল ওর সারা শরীরে মায়ের গায়ের গন্ধটা লেপ্টে যাচ্ছে, মায়ের আদরের মতোই। এই গন্ধটা সারাজীবন ওর কাছে ধরে রাখবে ঠিক করল ও, কিছুতেই মুছে যেতে দেবে না . . .বাবা বকলেও না।
(প্রকাশিত)







