কোনো একদিন – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে কোনো একদিন – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো-
কোনো একদিন – শাঁওলি দে :
(এক)
বিকেল থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের চমক ও মেঘের গর্জনে কেঁপে কেঁপে উঠছে জানালাগুলো। পাহাড় অঞ্চলে আঁধার নামে তাড়াতাড়ি। সন্ধে সাতটাতেই মনে হচ্ছে মধ্যরাত।
দার্জিলিঙ থেকে কিছুদূরের এক পাহাড়ি গ্রাম মাঙ্গওয়া। শান্ত সমাহিত এক গ্রাম, নিরিবিলিও। এখনও সেভাবে ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে এসে পৌঁছায়নি। এখানকারই একমাত্র রিসর্টে উঠেছে ওরা। এক পাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা তো অন্য পাশে নাথুলা রেঞ্জের অভিনব সহবস্থান।এহান ও রৈনী নেট ঘেঁটে খুঁজে বের করেছিল এই অপূর্ব ‘ডেস্টিনেশন’। হানিমুনের জন্য এমন জায়গাই তো মনে মনে চাইছিল ওরা।
রিসর্টের ঘরে বসে বৃষ্টি পড়া দেখছিল সদ্য বিবাহিত দুই প্রেমিক ও প্রেমিকা। প্রচন্ড জোরে মেঘের ডাক কানে আসতেই এহানের হাতটা শক্ত করে ধরল রৈনী। এহান হাসল। এই আলো আঁধারের খেলাতেই তা দিব্য টের পেল রৈনী। বলল, হাসলে যে ?
এহান বলল, এখনো এত ভয় ?
রৈনী বলল, ভয় পেলে কী করব বলো ?
এহান আরও খানিকটা শক্ত করে রৈনীর হাতটা ধরে বলল, ম্যায় হু না !
এবার রৈনী হেসে ফেলল। তারপর এহানের কাঁধের ওপর নিজের মাথাটা হেলান দিয়ে আরাম করে বসল।দুজনের মাঝে অদ্ভুত এক নীরবতা, অথচ কত কথাই না বলা হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি পলে অনুপলে। এহানের আঙুল জড়িয়ে ধরল রৈনীর আঙুলগুলোকে।দু’হাতের দশটা আঙুল পরস্পরকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল গভীর অশ্লেষে। বৃষ্টির ঝরঝর শব্দে মনে হল যেন মুক্তো ঝরছে চতুর্দিকে। বিদ্যুতের চমকের সঙ্গে সঙ্গে আকাশ থেকে নেমে আসছে অপরূপ এক মায়াবী আলো।
এই মায়াময় মুহূর্তের নৈঃশব্দ্যেকে ভেঙে দিয়ে এহান বলে উঠল, তোমার আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিনটার কথা মনে পড়ে ?
মনে আবার থাকবে না, আজও মনে হয় এই তো সেদিনের কথা ! রৈনী বলল।
তখন আমি কলেজের ফার্স্ট ইয়ার আর তুমি উচ্চমাধ্যমিক দেবে। নোট জেরক্স করতে গিয়েছিলে আমাদের পাড়ার টিপলুদার দোকানে। বিরাট এক পিঠ ব্যাগ থেকে ইয়া মোটা একখানা বই বের করেছিলে, এহান বলে।
হ্যাঁ, ফিজিক্সের বই, মল্লিক স্যার দিয়েছিল কয়েকঘন্টার জন্য, সেদিনই ফেরত দিতে হবে সেই শর্তে, রৈনী থামে, তারপর কয়েক মুহূর্ত পর বলে, সেদিনও এমন মুষলে বৃষ্টি হচ্ছিল, মনে আছে তোমার ?
ওরে বাবা, মনে নেই আবার ? আমরা বন্ধুরা ওখানে আড্ডা মারতাম।সবে সিগারেট খাওয়া শুরু করেছি তখন, যেই একটা ধরাতে যাব ওমনি দেখি ফ্রক পড়া একটা বাচ্চা মেয়ে কাকভেজা অবস্থায় এসে দাঁড়ালো একদম আমার সামনে। পিঠের ব্যাগটা তো ওর চাইতেও বেশি ওজনের।
অন্ধকারেই মুখ ভেঙালো রৈনী, ইস মোটেও অত ভারি ছিল না, দুটো মোটা মোটা বই ছিল এই যা আর ওটাকে ফ্রক বলে না মশাই, স্কার্ট বলে। বুদ্ধুরাম ! এহানের হাতে একটা চিমটি কাটে রৈনী।
আমি তো অবাক, ওত বাচ্চা মেয়ে আবার ফিজিক্স পড়ে ! এর তো সেভেন এইটে পড়ার কথা! এহানের গলায় ছদ্ম গাম্ভীর্য।
ওও, সেজন্য বুঝি ওই বাচ্চামেয়েটার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়েছিলে ? রৈনী কাঁধে মাথা রেখেই এহানের বাহু জড়িয়ে ধরে বসে।
সে কি আর সাধে দেখছিলাম, মেয়েটা তো আর কাউকে প্রশ্ন না করে আমাকেই জিজ্ঞেস করে বসল, আপনার এখানে জেরক্স কত করে ?
কী করতাম ? এক্কেবারে দোকানের ভেতরে জেরক্স মেশিনের সামনে বসেছিলে তুমি, পরে তো শুনেছি তোমার বন্ধুরা তোমায় খুব খ্যাপাত, তাই না ? রৈনী কথা শেষ করে খিল খিল করে হেসে ওঠে।
হ্যাঁ, কারো জেরক্স করার দরকার পড়লেই বলত, আপনার এখানে জেরক্স কত করে ? এবার দুজনেই সশব্দে হেসে ওঠে। বাইরে অবিরাম বৃষ্টির আওয়াজের সঙ্গে দুই প্রেমিক প্রেমিকার হাসিও মিলে মিশে গিয়ে এই পাহাড়ি গ্রামে অদ্ভুত এক অনুরণন তোলে।
হাসি থামলে জানালার পাশ থেকে উঠে গিয়ে ফ্লাস্ক থেকে গরম গরম কফি ঢালে রৈনী, তারপর একটা কাপ এগিয়ে দেয় এহানের দিকে। ঝমঝম বৃষ্টির দমক এখন অনেকটাই কমে এসেছে, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির গুঁড়ো গুঁড়ো ফোঁটা কাচের জানালায় এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। হালকা নীলাভ আলো জ্বলছে ঘরে। এহান পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে গান চালিয়ে দেয়।
‘রিম ঝিম এই ধারাতে, চায় মন হারাতে’, গানটা শুরু হতেই রৈনী বলে ওঠে, হিন্দী গান চালাও না, আওগে যব তুম সজনা, অঙ্গনা ফুল খিলেঙ্গে, বরষেগা শাবন… নিজেই গুনগুন করে ওঠে ও।
এহান ঘোর লাগা গলায় বলে, তুমিই গাও না, কী ভালো গাও ! ওই যে তখন ড্রাইভ করে আসার পথে গাইছিলে, তোমার গলায় অদ্ভুত মাদকতা আছে। আমার মতো বেসুরোরও গলা মেলাতে ইচ্ছে করে।
ধুত, ইচ্ছে করছে না।কেমন ভয় ভয় করছে আমার। রৈনী বলে ওঠে।
ভয় ? আমি আছি তো।এখন শুধু প্রাণ ভরে বাঁচার পালা, বুঝলে ? এহানের গলায় প্রতিশ্রুতি।
ওর কথা শুনে কেমন একটা স্বপ্নালু চোখে তাকায় রৈনী, তারপর বলে, এই স্বপ্নের মতো আমাদের বেঁচে থাকা সব মিথ্যে হয়ে যাবে না তো ?
এহান সশব্দে হাসে, বলেওঠে, আমি আছি তো, আমি করব তোমার সব স্বপ্ন পূরণ।
জানি, তবু কেন এত ভয় করে কে জানে ? রৈনী এহানের হাত দুটো খামচে ধরে বলে।
এহান মাথায় হাত বুলিয়ে ভরসা দেয় রৈনীকে, কিন্তু নিজে কি আশ্বস্ত হয় আদৌ ?
(দুই)
গল্পে, আদরে, খুনসুটিতে কখন রাত বাড়তে থাকে টেরই পায় না এহান ও রৈনী।চমক ভাঙে দরজার কড়া নাড়ার শব্দে।এহান শশব্যস্ত হয়ে ওঠে, বেয়ারা এসেছে হয়ত রাতের খাবার দিয়ে যেতে, তেমনই কথা ছিল।মোবাইল জ্বেলে সময় বোঝার চেষ্টা করল ও৷ ন’টা বেজে গিয়েছে।
গরম গরম রুটি, মুরগির পাতলা ঝোল আর কালো জিরে দিয়ে মোটা মোটা আলু ভাজা সহকারে ডিনারটা ভালোই হয় ওদের। এদিকে বৃষ্টি থামার নাম নেই। রৈনী আক্ষেপ করে, ভাবলাম একটু বের হব, রাতে পাহাড়ি অঞ্চলে হাঁটার মজাই আলাদা।
আগে খুব হেঁটেছ মনে হচ্ছে। সেই তো নাকি পাহাড়ে এসেছিল ক্লাস ফোরে পড়তে, নাক দিয়ে দুধ পড়ত তখন, এহান ব্যঙ্গ করে বলে।
হুহ, আসিনি তো কী, কারো কাছে কি শুনিওনি ? সবসময় আমাকে নিয়ে মজা না ? দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা। রৈনী ঘুষি মারার ইঙ্গিত করে এহানকে।
এহান পাত্তা না দিয়ে বলে, চিন্তা করো না, ঠিক পাহাড়ের রাস্তায় রাতের বেলা হেঁটে যাব আমরা, হাত ধরাধরি করে, ঠিক এমনি ভাবে। রৈনীর হাত ধরে এহান।
রৈনী গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে এহানকে। বলে, উফ ! এত উত্তেজনা তোমার হাত ধরে চলে আসার সময়ও হয়নি।
এহান হেসে বলে, বলছ ?
রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৃষ্টির দমক। মনে হচ্ছে আকাশের সব জল বুঝি আজই শেষ হয়ে যাবে। তার সঙ্গে তো মেঘের গর্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি আছেই। এমন অদিনে এই রকম আবহাওয়ায় এহান আর রৈনীর মনে হয় ওরাই হয়ত এই পৃথিবীর শেষ নর নারী, আর কোত্থাও কেউ নেই।
গল্পের মাঝে এহান বলে, তুমি একটু ঘরে থাকো, আমি একটা টান দিয়ে আসি, হাতে ধরা সিগারেটটা দেখায়ও, তোমার তো আবার গন্ধে সমস্যা হয়।
ছেড়েই দাও ওটা, কী এমন সুখ ওই টানে ? রৈনী আবদারের গলায় বলে। ওর কথা শেষ হতে না হতেই নীল বাতিটা নিভে যায় হঠাৎ করে। চারিদিকে এখন মিশকালো অন্ধকার। যেন মনে হচ্ছে কে যেন এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়েছে পৃথিবীর যাবতীয় আলো। এহান বলে, কী ব্যাপার ইনভার্টার নেই নাকি !
বিরক্ত হয় রৈনীও, বলে কী জায়গারে বাবা ! এমন অন্ধকার আগে দেখিনি। উফ ! পকেট থেকে লাইটারটাবের করে জ্বালায় এহান। আলোর শিখা দপ করে জ্বলে উঠতেই এহান চমকে ওঠে। রৈনী কোথায় ? এই তো এতক্ষণ হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল ওর। লাইটারের লেলিহান শিখাটা এদিক ওদিক ঘুরিয়ে ও রৈনীকে খুঁজে পায়না ও, ভয়ে চিৎকার করে ওঠে এহান, রৈনী…
কিন্তু ওই মিশকালো অন্ধকারের একা ঘরে ওর আর্তি গুমরে গুমরে ওঠে।
(তিন)
কলেজের বিরাট করিডোরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল এহান। দূর থেকে রৈনীকে আসতে দেখেই জ্বলন্ত আগুনের কাঠিটা পা দিয়ে পিষে দিল ও। দেখতে পেলেই বকবক শুরু করবে। বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে আসছিল রৈনী। এহানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাসল একটু। তারপর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল, তোরা এগো, আমি আসছি।
বন্ধুরা এগিয়ে যেতেই রৈনী এহানকে চাপাস্বরে বলল, কাল একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি, জানো তো ?
কী স্বপ্ন ? এহান জানতে চায়। রৈনী একটু চুপ করে থেকে বলে, আমি আর তুমি হনিমুনে গেছি। কোথায় বলো তো ? মাঙ্গওয়া রিসর্টে, যেটা সেদিন গুগলে দেখছিলাম। খুব বৃষ্টি পড়ছিল জানো, আমরা জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখছিলাম। তুমি আমায় গান করতে বললে।
এহান অবাক গলায় প্রশ্ন করে, তারপর ?
তারপর ডিনার শেষে তুমি যখন সিগারেট খেতে বাইরে যেতে চাইলে ওমনি কারেন্ট চলে গেল। আমি মোমবাতি জ্বালালাম। ব্যস, তারপর আর তুমি নেই কোথাও। আমি চিৎকার করে তোমায় ডাকলাম, জানো ? কিন্তু…
আর আমায় পেলে না, তাইতো ? এহান হাসে। কিন্তু গলার থেকে বিষ্ময়ের ভাবটা যায় না।
বলে, যদি বলি আমিও এই একই স্বপ্ন দেখেছি কাল, বিশ্বাস করবে ?
রৈনী একটু জোরেই বলে, মানে ?
হ্যাঁ, একই স্বপ্ন।শুধু শেষটায় আমার বদলে তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে, আর আমি চিৎকার করে ডাকছিলাম তোমায়।
রৈনী বিরাট হা করে।অবাক গলায় বলে, এও সম্ভব ?
(চার)
বার চারেক দরজার কড়া নাড়ে মনোজ থাপা, রিসর্টের মালিক। খাবার দিতে এসে ছেলেটি ঘুরে গেছে কয়েকবার। ওপাশ থেকে কেউ দরজা তো খোলেইনি, সাড়াও মেলেনি কোনো। এইজন্য এইসব কমবয়সী ছেলেমেয়েদের ঘর দিতে চান না তিনি, কিন্তু কী করবেন আর, ভ্যালিড কাগজপত্র থাকলে আর কিছুই করার থাকে না।
আরও একবার ডাকার পরও যখন সাড়া মেলে না দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েন তারা। যা আশঙ্কা করছিলেন ঠিক তাই। বিছানার ওপর শুয়ে আছে গতকাল বিকেলে আসা দুই স্বামী স্ত্রী। পাশে একটা খোলা ডায়েরির পাতাগুলো পত পত করে উড়ছে বাতাসে। ডায়েরির নিচে একটা প্রেস্ক্রিপসন। একটু ঝুঁকে ডায়েরির লেখাগুলো পড়ার চেষ্টা করলেন তিনি। বাঙলাটা ভালোই পড়তে পারেন বলে অসুবিধা হল না।
সোফার ওপর ধপ করে বসে পড়লেন মনোজ থাপা। এমন প্রেমও হয়।এ যে স্বর্গীয় ! ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে লাগলেন তিনি, পড়ে ফেললেন এহান ও রৈনীর স্বপ্নের কথা। প্রেস্ক্রিপশনেও চোখ বোলালেন আলতো করে। রৈনী বসুর প্রেস্ক্রিপশন, বাম দিকে লাল কালির আন্ডারলাইনে ইংরাজিতে লেখা ‘লিউকোমিয়া।’ তবে কি একে অন্যকে হারিয়ে ফেলার ভয়েই নিজেদের একসঙ্গে শেষ করে দিল ওরা ? ডায়েরিতে লেখা স্বপ্নের মতো রাত কাটানোর জন্যই কি তবে ওদের এই রিসর্টে আসা ?
এর উত্তর ওই ডায়েরির পাতায় নেই। মনোজ থাপা চোখ বন্ধ করলেন। আবার বৃষ্টি শুরু হল ঝমঝম সুরে, মনোজের মনে হল কারা যেন ওপর থেকে অসংখ্য পারিজাত ছড়িয়ে দিল এহান ও রৈনীর শরীরের ওপর।
(এখন ডুয়ার্স, বর্ষা সংখ্যা আগষ্ট, ২০২০)
#প্রেমেরদিন #কিছুগল্পকিছুকথায়শাঁওলিদে #বৃষ্টিফোঁটারমতো #প্রকাশিতগল্প #শাঁওলিদে #মানচিত্র #মায়াঘর







