hauli-shaunli-dey

হাউলি – শাঁওলি দে

EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে হাউলি – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো – 

হাউলি – শাঁওলি দে : 

বড় রাস্তাটার বাঁদিকে আরও একটা ছোট গলি। এক পাশে কিছুদূর এগোলে বি এস এফ ক্যাম্প, অন্যপাশটায় দু’শ মিটার গেলেই স্কুল। জুনিয়ার হাইস্কুল, যাকে মিডল স্কুলও বলে কেউ কেউ। হাইস্কুলগুলোর মতোই সবকিছু শুধু ছাত্রছাত্রী সংখ্যা খুব কম। একই মাঠে প্রাথমিক স্কুল ও অঙ্গনয়ারী সেন্টার। আশ্চর্যের বিষয় সেন্টার থেকে প্রাথমিক পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী সংখ্যা বেশি থাকলেও মিডল স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা প্রায় তলানিতে ঠেকে। একে তো আশেপাশে একের বেশি হাইস্কুল থাকেই, তারপর ফাইভ থেকে এইট অবধি এক স্কুলে পড়ে ক্লাস নাইনে আবার নতুন স্কুলে ভর্তির ঝক্কি সামলাতে চায় না কেউই।
এই অঞ্চলটা মূলত চাষবাস কেন্দ্রিক। প্রতিটি পরিবারেই বিঘা বিঘা না হোক কিছুটা জমি আছেই। একান্তই যাদের নেই তারা এর ওর জমিতে হাউলি দিয়ে বেড়ায়। কেউ কেউ অবশ্য বেশি টাকা কামাইয়ের চেস্টায় বাইরে চলে বেশ কিছু মাস বা বছরের জন্য। কেরলে কিম্বা গ্যাংটকে বছরের একটা সময়ে দলবেঁধে পাড়ি দেয় তারা। পরিযায়ী শ্রমিক শব্দটা আজকাল এই অঞ্চলেও বেশ জনপ্রিয়।
স্কুলের মাঠটার একপ্রান্তে মিডল স্কুল, অন্যদিকটায় প্রাথমিক বিভাগ। ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত গুড়ি গুড়ি ছেলেমেয়ে দিয়ে উপচে পড়ে ক্লাসরুমগুলো। টিফিনের সময় মাঠভর্তি ছেলে মেয়ে নিজেদের মধ্যে খে্লাধূলায় মেতে ওঠে। কতরকম যে তাদের খেলা তার ইয়ত্তা নেই। একদল গোল্লাছুট খেলছে তো অন্যদল গোল হয়ে বসে রুমাল চোরকে ধরার চেস্টা করছে। কেউ বা স্যরের কাছে গিয়ে ফুটবল আদায় করার বায়না জুড়েছে। কতরকমের কর্মকান্ড যে চলতে থাকে তা লিখে শেষ করা যাবে না।
মিডল স্কুলটা সেই তুলনায় শান্ত অনেকটাই। ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে ওঠার সময় অনেকেই ভর্তি হয়নি এখানে। অথচ দিদিমণি মাস্টারমসাইদের চেস্টার ত্রুটি থাকে না কোনোবারই। তবু! বেশিরভাগই পাশের উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছুটেছে। হাতেগোনা যে কয়েকজন মিডল স্কুলে নাম লিখিয়েছে তারা একেবারে গরীবঘরের। বেশিরভাগেরই পড়ার ইচ্ছে নেই তেমন, আর প্রত্যেকেই পড়ার পাশাপাশি জমির কাজকর্মে হাত লাগায়।

স্কুলটাকে দূর থেকে দেখে মনে হয় ঠিক যেন একটা দ্বীপ। শুধু চারপাশে জলের পরিবর্তে সবুজে সবুজ। বছরের ঋতুপরিবর্তন এখানে এলেই বেশ বোঝা যায়। কখনো ধান, কখনো আখ, কখনো পাট, কখনো বা লঙ্কা বা আলু গাছে ভরে থাকে চারিপাশ। একসময় রোয়া বোনা, অন্য ঋতুতে কাটা, এভাবেই বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। ক্লাস ফাইভ থেকে ছেলেমেয়েরা বড় হতে হতে এইটে ওঠে। আবার ধান কাটার সময় এসে যায়। পুরোনো মুখগুলো ফিকে হতে হতে একসময় মুছে যায়। বছরের শুরুতে আবার নতুন কলরবে, নতুন মুখে উজ্জ্বল হয় চারিদিক। নতুন ফসল ঘরে ওঠে। নতুন ফসলের গন্ধে পুরোনো সব কিছুটা হলেও ফিকে তো হয়ই, তাই না?

এই বছরের মিডল স্কুলের ছাত্র সংখ্যা মাত্র ত্রিশ। অবশ্য খাতায় কলমে ত্রিশ হলেও আসে আরও কম। কোনো কোনোদিন তো এক দুইজনকে নিয়েও স্কুল চালাতে হয়। যদিও দিদিমণি, মাস্টারমশাইয়ের সংখ্যাও কোথাও দুই, কোথাও তিন, এর বেশি নয়। তবুও! সব ক্লাসই সবাইকে নিতে হয়, স্কুল স্কুল ফিলিংসটা আসে না, অনেকটা প্রাইভেট টিউশনের মতো লাগে আর কী!

যে কয়েকজন ছাত্র পড়তে আসে স্কুলে তাদের প্রত্যেকের বাড়িই স্কুল লাগোয়া, আর প্রায় প্রত্যেকেই দারিদ্রসীমার নিচে। কোনোদিন ভরপেট খাওয়া জোটে তো কোনোদিন কিছুই না। স্কুলে এলে তাও মিড ডে মিলটা পাওয়া যায়। সেদিন হাসিমুখে বাড়ি ফেরে ওরা।

তবু সবদিন ওদের স্কুলে আসা হয় না। বাড়িতে থেকে হাতে হাতে আকে সাহায্য করতে হয়, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা জমিতে ছুটতে হয় বাবা মায়ের সঙ্গে। অনিচ্ছে সত্ত্বেও লঙ্কা তোলা, ধান কাটা, পাট ছোলায় হাত লাগাতে হয়।
তুষার ক্লাস এইটের ছাত্র। গতবছরও নিয়মিত স্কুলে আসার চেস্টা করত ছেলেটা। কিন্তু এই বছর ওকে বেশি স্কুলে দেখাই যায় না। পড়াশোনাটাও হয়ত করে না ঠিকমতো। যেদিন যেদিন স্কুলে আসে সবার পেছনের বেঞ্চে বসে, অমনোযোগী থাকে। ওকে নিয়ে স্টাফরুমে আলোচনাও হয়, কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পাওয়া যায় না।

সুশান্ত স্কুলে আসে না অনেকদিন। ফোন করলে নট রিচেবল বলছে বারবার, অবশেষে দুজন বন্ধুকে বাড়িতে পাঠালে খবর আসে ও আর পড়াশোনা করবে না। বাবার সঙ্গে রোজ অন্যের জমিতে কাজ করতে যায় ও। সাতজনের বিরাট সংসার বাবার পক্ষে একা টানা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, তাই ক্লাস এইটের সুশান্তর আর পড়া চালানো সম্ভব হয় না।
ললিতা আর লক্ষ্মী দুই বোন, সেকেন্ড ইউনিট টেস্টের পর থেকে দুটোই স্কুলে আসছে না। স্কুল চত্ত্বর থেকে একটু দূরে ওদের বাড়ি। অন্যান্যদের কাছেও খবর বিশেষ পাওয়া যায় না। হেমা একদিন খবর আনে কীর্তনের দলের সঙ্গে ওরা বাইরে কোথাও গেছে।

মনে পড়ে যায়, ললিতা দারুণ কীর্তন করে। যদিও খুবই লাজুক, তবু স্কুলে একদিন শুনিয়েছিল। ওদের একটা ছোট্ট দল আছে, একজন হারমোনিয়াম বাজায়, একজন ঢোল, আর একজন করতাল। গানটা ললিতাই করে, অন্যেরাও অবশ্য গলা মেলায়। ভারী মিঠে গলা মেয়েটার। তেমন সহযোগিতা পেলে হয়ত অনেকদূর যেতে পারত।
গুটিকয়েক মেয়ের মধ্যে হেমাটাই যা একটু সিরিয়াস। বাড়ির কাজ টাজ সামলে একমাত্র ওই রোজ স্কুলে আসে। নিজেদের ঘর ঝাড়ে, ছোট্ট স্কুলটার খেয়াল যত্ন রাখে। মাঠ পরিস্কার করে নিজের উদ্যোমে। মিড ডে মিলের রান্না কোনো কোনোদিন খারাপ হলে দলের নেত্রী হয়ে নিজেদের মা কাকিমাদেরই নামে অভিযোগ নিয়ে আসে। সব মাস্টারমশাই দিদিমণিদের বড্ড ন্যাওটা মেয়েটা। এবছর অন্য স্কুলে চলে যাবে, সেজন্য মাঝেমধ্যেই ডুকরে কেঁদে ওঠে।

সঞ্চিতা আর ঝুমকি একদিন ক্লাসে নিজেদের মধ্যে খাতা নিয়ে ঠেলাঠেলি করছিল। একজন অন্যজনকে বলছিল তুই দেখা। না, না তুই আগে দেখা। চেয়ার ছেড়ে উঠতেই খাতাটা টেনে নিয়ে দেখা গেল দুজন ছবি এঁকেছে। অপূর্ব দুটো ছবিই, একজন এঁকেছে গণেশ, অন্যজন স্কুলটারই বাইরেটা। দিদিমণি অবাক হয়ে জানতে চায়, তোরা আঁকা শিখিস নাকি? দুজনের সলজ্জ ঘাড় নাড়ে, না তারা শেখে না। তবে? নিজে নিজেই মন থেকে আঁকি ম্যাম, রঙ থাকলে রঙও করে দিতে পারতাম।
তোদের রঙ নেই?
ঝুমকি বলে ওঠে, ছিল ম্যাম, শেষ হয়ে গিয়েছে। বাবা এখন কিনে দিতে পারবে না।
সঞ্চিতার বাবা মা কেউ নেই, দাদুর কাছে মানুষ ওরা তিনবোন। কেমন ভাবে চলে ভাবলে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। বড়টা কলেজে পড়ে, মাঝেরজন সঞ্চিতা ক্লাস সেভেন, অন্যটা বেশ ছোট ক্লাস ফোর। ওদের মা ফাঁসি দেয় যখন ছোটটার বয়স দেড়। বাবা সেই থেকে নিরুদ্দেশ। খবর আসে অন্য কোথাও সংসার পেতেছে সে, যদিও কখনো কখনো সঞ্চিতাকে জিজ্ঞেস করলে ও ধীর গলায় বলে, বাবা নেই, মরে গেছে। বলে শুকনো মুখটা ঘুরিয়ে নেয় মেয়েটা। সত্যি তো যে বাবা তিন তিনটে মেয়ের দায়িত্ব ঝেড়ে দিয়ে নির্দিদ্ধায় নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে পারে, সে তো মেয়েদের কাছে মৃতই হবে, তাই না?

সঞ্চিতার দাদুর বয়স আশির ওপর, দিদিমাও পঁচাত্তর তো হবেই। বয়সের ভার বেশি না দায়িত্বের তা বোঝা যায় না। ভদ্রলোক চোখেও দেখেন না ঠিকমতো। তবু তিনটে মেয়েকেই পড়াচ্ছেন, যত্নআত্তি করছেন এটাই অনেক।
প্রতিটি ঘরেই নানা কাহিনি, শুনতে শুনতে চোখে জল চলে আসে। দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা যে প্রতিটি পরিবারে গা লেপ্টে আছে। তার মধ্যে যেদিন ওরা স্কুলে আসে স্কুলঘরটা গমগম করে। টিফিনের সময়ে মাঠটা ভরে থাকে ওদের কলকাকলীতে। ওদের হাসি আড্ডা মজা ভুলিয়ে দেয় মনের ভেতরের কষ্টগুলোকে।

সেদিন অনেকদিন পর লক্ষ্মীকে স্কুলে দেখা গেল। একেবারে শেষ বেঞ্চে একটু যেন জরোসরো হয়ে বসে আছে। চোখে মুখে ভয়, লজ্জা সবই যেন মিশে আছে। কাছে যেতেই ডুকঁরে কেঁদে উঠল ক্লাস সেভেনের মেয়েটা।
জানা গেল, কীর্তনের দলেরই একজন লোকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছে ও। বাবা মা’কে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করল দিদিমণি, মাস্টারমশাইয়েরা। কিন্তু কোনো লাভ হল না। বরং ওর বাবা জানালো, একটা পেট তো কমল দিদিমণি। চার চারটে মেয়ে, একটা ছোট্ট ছেলে, বউ, মা, আমি একা কাজে যাই। পালিয়ে বিয়ে করে আমার উপকারই তো করেছে! এই কথার কোনো উত্তর হয় কিনা সত্যি কারো জানা নেই।

ফাইনাল পরীক্ষার আগেই তুষারকে মাঠের কোণায় বসে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করা গেল। দাঁতে একটা কাঠি নিয়ে নির্বিকারভাবে চিঁবোচ্ছে। চিৎকার করে ডাকতেই ধীর পায়ে স্টাফ রুমের দিকে এগিয়ে এল ও।
কি রে স্কুল আসছিস না কেন? সামনেই তো ফাইনাল পরীক্ষা, ক’টা দিনই বা আছে? তারপরই তো অন্য স্কুল। এ’কটা দিন অন্তত আয়।

মাথা নিচু করল তুষার। কালো ফুলছাপ গোল গলা গেঞ্জি বেশ নোংরা, কাদা মাটি লেগে আছে। হাতে গাঢ় তুঁতে রঙে রিস্ট ব্যান্ড, স্টিলের বালা। স্কুলেরই নীল রঙের প্যান্ট, সেটারও অবস্থা শোচোনীয়।
কি রে আসিস না কেন স্কুলে? পড়বি না আর? একজন মাস্টারমশাই জানতে চান।
দু’পাশে ঘাড় নাড়ে তুষার। মানে সে আর পড়বে না। চমকে তাকায় দিদিমণি, মাস্টারমশাইরা। পড়াশোনায় ভালো ছিল ছেলেটা। এমন কত ছেলে যে মাঝপথে পড়া থামিয়ে দেয়!
কেন রে? কেরল যাবি? দিদিমণি জিজ্ঞেস করেন।
না ম্যাম। এখানেই হাউলি খাটব। তুষার মাথা তুলে জবাব দেয় এবার।

শহরের দিদিমণি মাস্টারমশাইরা হাউলি বোঝেন না। তাঁরা সবাই অবাক চোখে তাকায় তুষারের দিকে। তুষার যেন পড়তে পারে সেই ভাষা, ধীর গলায় বলে, ম্যাম হাউলি খাটলে সারাদিন শেষে ভরপেট মাংস ভাত পাওয়া যায়। আমরা কখনো কখনো অন্যের জমিতে কাজ করি সারাদিন ধরে, সেই সকাল থেকে সন্ধে আমাদের খাটতে হয়। কখনো পাট কাটি, ছুলি, কখনো লঙ্কা তোলা, কখনো ধান বোনা বা কাটা, মানে জমির যত কাজ আছে সেগুলো করি। দিনের শেষে ওরা ভরপেট মাংস ভাত খাওয়ায়। টুকটাক হাত খরচও জুটে যায়। স্কুলে এলে কাজ করা হয় না। বাড়িতে সমস্যা হয়।

সত্যিই তো! চোখে জল এসে যায় সবার। স্কুলে পড়লে রোজ মিড ডে মিলে নানা পদ পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু প্রতিদিন ভরপুর মাংস ভাত আর হাত খরচের টাকা, এই গরীব দেশে এটাই কি অনেক নয়?

তুষার কথা শেষ করে বাড়ির দিকে রওনা দেয়। ওর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মন কেমন করে ওঠে সকলের। পড়াশোনা, মিড ডে মিল, নানা সরকারি প্রকল্পের ভিড়েও গরীবের হাউলি দেওয়ার কাজ শেষ হয় না।

এমন কত তুষার হারিয়ে যায়, আবার কে বলতে পারে এই তুষারই একদিন হাউলি খাটতে খাটতে নিজেই হাউলি দেওয়ার কাজ করবে না?

(প্রকাশিত গল্প)

হাউলি - শাঁওলি দে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top