ek-drirocheta-nari-satyaboti-shaunli-dey

এক দৃঢ়চেতা নারী, সত্যবতী – শাঁওলি দে

EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে এক দৃঢ়চেতা নারী, সত্যবতী – শাঁওলি দে রচিত এখন ডুয়ার্স-এ পুরাণের নারী বিভাগে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত, পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো – 

এক দৃঢ়চেতা নারী, সত্যবতী – শাঁওলি দে : 

puraner nari

মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সত্যবতী। আদি পর্বের একশ সাতাশত অধ্যায়ের পর থেকে তাঁর উল্লেখ আর না থাকলেও মহাভারতের মূল ঘটনার সূত্রপাতই সত্যবতীর জীবন থেকে।

মহাভারতে রাজা শান্তনু, সত্যবতী ও ভীষ্মের কাহিনী খুব বেশি প্রচলিত। সে গল্পে যাওয়ার আগে সত্যবতীর জন্মকাহিনী জানা আবশ্যক। সত্যবতীর জন্মের গল্পটি অদ্ভুত। চেদীরাজ উপরিচর বসু একবার শিকারে গিয়ে পত্মীর কথা মনে করে কামাতুর হয়ে পড়েন এবং সেখানেই বীর্যপাত ঘটান। এরপর তিনি একটি শ্যেনপাখিকে সেই বীর্য দিয়ে অনুরোধ করেন তাঁর স্ত্রীকে পৌঁছে দিতে। রাজা উপরিচর বসুর কথামতো সেই শ্যেনপাখি বীর্য নিয়ে যাওয়ার সময় সেটি যমুনার জলে পরে যায় ও অদ্রিকা নামের এক মৎস্যকন্যা তা খেয়ে গর্ভবতী হন। অদ্রিকা নিজেও ছিলেন একজন শাপগ্রস্ত মৎসরূপিণী অপ্সরা।

এর কিছুকাল পর ধীবররাজ দাশের জালে মৎস্যরূপী অদ্রিকা ধরা পড়লে, দাশ দেখেন তাঁর গর্ভে রয়েছে একটি পুত্র ও একটি কন্যা। কালক্রমে তাদের জন্ম হয় ও ধীবররাজ সেই উপরিচর বসুর কাছেই ওদের নিয়ে যান। চেদীরাজ নিজে পুত্রটিকে গ্রহণ করলেও কন্যাটিকে ধীবররাজকে দিয়ে দেন। কন্যাটির গায়ে তীব্র মাছের গন্ধ থাকায় তাঁকে মৎসগন্ধাও বলা হয়। গায়ের রঙ কালো বলে তাকে কালীও বলা হত। এই মৎসগন্ধাই হলেন পরমাসুন্দরী সত্যবতী। অন্যদিকে তাঁর যমজ ভাইটি পরবর্তীকালে মৎসরাজ নামে এক ধার্মিক রাজা হন। এই সত্যবতীই ঘটনাক্রমে পান্ডব ও কৌরবদের প্রপিতামহী। এই প্রসঙ্গে আরও একটি কথা জেনে রাখা প্রয়োজন, সত্যবতী কুমারী অবস্থায় ঋষি পরাশরের ঔরসে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন যাকে আমরা ব্যাসদেব বলে চিনি। এক দ্বীপে জন্ম হয়েছিল বলে তাঁর আরেক নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, যিনি স্বয়ং এই প্রকান্ড মহাকাব্যের রচয়িতা।

ঋষি পরাশর একবার যমুনা পার করার সময় একটি সুন্দরী রমনীর নৌকায় ওঠেন এবং তাঁর রূপ দেখে মুগ্ধ ও কামাতুর হন। সেই সুন্দরী নারীই হলেন সত্যবতী। পিতা ধীবররাজ দাশের কথামতো তিনি যমুনায় নৌকা চালাতেন। শরীরে গন্ধ থাকায় কেউ তাঁর কাছে ঘেঁষত না। ঋষি পরাশর সত্যবতীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে মিলিত হতে চান। সেই সঙ্গে তাঁদের পুত্রসন্তানেরও কামনা করেন। কিন্তু দিনের আলোয় ও যমুনা নদীর তীরে থাকা অসংখ্য মানুষের সামনে মিলিত হতে রাজি হন না সত্যবতী। পরাশর মুনি তখন মন্ত্রবলে এক মায়াবী কুয়াশার সৃষ্টি করেন ও মিলনের জন্য সত্যবতীকে কাছে ডাকেন। সত্যবতী তবু কুমারী অবস্থায় তার কৌমার্য হারাতে রাজি হন না। প্রেমে ও কামে কাতর ঋষি পরাশর সেই মুহূর্তে জানান যে, মিলিত হলেও সত্যবতী কুমারীই থাকবেন এবং তৎক্ষনাৎ সন্তানও ভূমিষ্ট হবে যাতে গর্ভধারনও কারো চোখে না পড়ে। সেই সন্তানকে ঋষিই পালন করবেন সে কথাও দেন। অবশেষে সত্যবতী রাজি হন ও পরাশরের ঔরসে ব্যাসদেবের জন্ম দেন। পরাশরের আশির্বাদে তাঁর শরীর থেকে মাছের গন্ধ চলে গিয়ে সুমিষ্টঘ্রাণ আসতে থাকে। বহু যোজন দূর থেকে সেই গন্ধ পাওয়া যেত বলে সত্যবতীর আরেক নাম যোজনগন্ধাও।

এই ঘটনার বেশ কিছুকাল পর হস্তিনাপুরের রাজা শান্তনুর সঙ্গে সত্যবতীর দেখা হয়। অপরূপ সুন্দরী ও সুগন্ধী সত্যবতীকে দেখে শান্তনু তাঁকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন ও হস্তিনাপুরের রাজমহিষী করতে চান। কিন্তু সত্যবতীর পিতা ধীবররাজ সব শুনে রাজা শান্তনুর কাছে করজোরে বলেন, যদি রাজা কথা দেন যে তাঁর এবং সত্যবতীর সন্তানই ভবিষ্যতে হস্তিনাপুরের রাজা হবেন তবেই তিনি তাঁর কন্যাকে রাজার হাতে তুলে দেবেন। রাজা শান্তনুর দেবী গঙ্গার গর্ভজাত পুত্র দেবব্র‍ত যে হস্তিনাপুরের যোগ্য উত্তরাধীকারী সে বিষয়ে ধীবররাজ নিশ্চিত ছিলেন। দাশের কথা শুনে শান্তনু মর্মাহত হন ও হস্তিনাপুর ফিরে যান। কারণ এই কথা মানার কোনো ইচ্ছেই ছিল না সেই মুহূর্তে। দেবব্রত ছিলেন সব দিক দিয়েই যোগ্যতম। কিন্তু বাড়ি ফিরে তিনি বিমর্ষই থাকতেন সারাক্ষণ। সত্যবতীর সৌন্দর্যে প্রায় পাগল হয়ে উঠছিলেন তিনি। পুত্র দেবব্রত এক বিশ্বস্ত মন্ত্রীর কাছে সব ঘটনা শুনে নিজেই ধীবররাজের সঙ্গে দেখা করেন।

ধীবররাজের কথা শুনে দেবব্রত প্রতিজ্ঞা করেন তিনি কখনোই হস্তিনাপুরের সিংহাসনের দাবীদার হবেন না। তখন ধীবররাজ দাশ আরও বলেন যে, দেবব্রত রাজা হবেন না তিনি নিশ্চিত, কিন্তু তাঁর সন্তানেরাও যে দাবী করবেন না এ কথা কে বলতে পারে ! এই কথা শুনে দেবব্রত সকল দেবদেবীকে সাক্ষী রেখে এক ভীষন প্রতিজ্ঞা করেন। ধীবররাজ দাশ ও সত্যবতীকে বলেন সারাজীবন ব্রহ্মচর্য পালন করবেন যাতে তাঁর কোনোদিন কোনো পুত্রই হতে না পারে। ব্রহ্মচর্য পালন করলেও তিনি স্বর্গেই স্থান পাবেন এই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

এরপর আর না করার কিছু থাকে না। ধীবররাজ খুশি হন এবং রাজা শান্তনুর হাতে সত্যবতীর হাত সঁপে দেন। শান্তনু পুত্র এই এতবড় আত্মত্যাগে মোহিত হয়ে তাঁকে ইচ্ছামৃত্যুর আশির্বাদ করেন। দেবব্রত এই ভীষন প্রতিজ্ঞার জন্য ভীষ্ম নামে পরিচিত হন। আর এইভাবেই সত্যবতীর হস্তিনাপুরে আগমন ঘটে ও এক নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হয়।

শান্তনু ও সত্যবতীর বিবাহ পরবর্তী জীবন সুখেরই ছিল। তাঁদের চিত্রাঙ্গদ ও বিচিত্রবীর্য নামে দুই পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু দুজনেই ছিলেন ক্ষণজন্মা। চিত্রঙ্গদের মৃত্যুর পর খুব কম বয়সে বিচিত্রবীর্য রাজা হন। সত্যবতীর আদেশে তখন ভীষ্মই ভাইকে সিংহাসনে বসিয়ে রাজত্ব চালান এবং কাশীরাজের দুই কন্যা অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে বিয়ে দেন। বিয়ের কিছুদিন পরই যক্ষ্মা রোগে বিচিত্রবীর্য মারা গেলে সত্যবতী নিজের কথা থেকে সরে এসে বংশরক্ষার জন্য ভীষ্মকে অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে বলেন। ভীষ্ম নিজের কথায় অনড় থাকলে সত্যবতীর আদেশেই তাঁর অপর পুত্র ব্যাসদেবকে বলেন অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে পুত্র উৎপাদন করতে, যার ফল স্বরূপ ধৃতরাষ্ট্র ও পান্ডুর জন্ম হয়।

জন্মাদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র বড় বলেও শারীরিক কারণে সিংহাসনে বসতে পারেন না, পান্ডুই হন রাজা। তাঁর দুই পত্নী কুন্তী ও মাদ্রী। কিন্তু বনবাসে থাকাকালীন পান্ডুরও অকালমৃত্যু হল। সহমরণে যান মাদ্রী। কুন্তী পাঁচ পুত্রকে নিয়ে হস্তিনাপুরে ফেরেন, অন্যদিকে ধৃতরাস্ট্রের স্ত্রী গান্ধারীও একশ পুত্র ও একটি কন্যার জন্ম দেন। হস্তিনাপুর জমজমাট হয়ে ওঠে। কিন্তু নিজের দুই পুত্র ও পৌত্র পান্ডুর অকাল মৃত্যুতে কার্যত ভেঙে পড়েন সত্যবতী। তার ওপর আবার ব্যাসদেব জানান খুব শীঘ্রই পান্ডব ও কৌরবদের জীবনে আরও অন্ধকার নেমে আসবে, ধ্বংস হবে হস্তিনাপুর রাজ্য। সে ধাক্কা কি আদৌ সত্যবতী সামলাতে পারবেন ? ব্যাসদেবের কথা শুনে সত্যবতী অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে বাণপ্রস্থে যান ও কিছুদিন পর দেহত্যাগ করে স্বর্গে যাত্রা করেন।

এরপর আর সত্যবতীর কোনো উল্লেখ নেই মহাভারতে। তবু সম্পূর্ণ মহাভারতই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর ওপর। ঋষি পরাশরের সঙ্গে মিলনের ফলে জন্ম তাঁর পুত্র মহাভারতের রচয়িতা এবং পান্ডু ও ধৃতরাষ্ট্রের পিতা। অন্যদিকে দেবব্রতকে দিয়ে করানো প্রতিজ্ঞার ফলেই মহাভারতের মূল ঘটনার সূত্রপাত। প্রশ্ন জাগে যদি সত্যবতী এই প্রতিজ্ঞা না করাতেন তবে কি আদৌ মহাভারত রচিত হত ?

সত্যবতীর চরিত্র পর্যালোচনা করলে আমরা এক দৃঢ়চেতা রমনীকে খুঁজে পাই। সেই যুগে দাঁড়িয়ে অশিক্ষিত হয়েও তিনি যেভাবে ঋষি পরাশরের থেকে কৌমার্য ঢাকার প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন তাতে এই প্রমান হয় যে, ঋষি যে তাঁকে বিয়ে করবেন এই নিয়ে তাঁর কোনো দিবাস্বপ্ন ছিল না। তিনি অত্যন্ত বাস্তববুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন। পরেও রাজা শান্তনুর সঙ্গে বিয়ের কথা উঠলে তিনি নিজের ও সন্তানদের জায়গা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সুরক্ষিত করে গেছেন। সেই সময়ের দিক দিয়ে বিচার করলে এই কারণেই সত্যবতীর চরিত্রটি অনেকের থেকে এগিয়ে থাকবে। ছেলেদের মৃত্যুর পর তাঁদের সন্তান না থাকায় তিনি পুত্রবধূদের অন্যের ঔরসে পুত্র উৎপাদনের আদেশ দেন। এতে তাঁর আধুনিক মনোভাবেরও পরিচয় মেলে।

হরিবংশ ও দেবীভাগবত পুরাণে সত্যবতীর কাহিনী লেখা আছে। মহাভারতে তিনি বিভিন্ন নামে পরিচিতা। গায়ে মাছের গন্ধ যখন তখন তিনি গন্ধকালী, আবার পরাশরের বরে সুগন্ধী হলে তিনি তখন গন্ধবতী। দাশরাজের কন্যা বলে ভীষ্ম তাকে দাশেয়ী নামেও সম্বোধন করতেন। বসুরাজের কন্যা জন্য তিনি বাসবী নামেও পরিচিত।

(পুরাণের নারী – এখন ডুয়ার্স ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত)

এক দৃঢ়চেতা নারী, সত্যবতী - শাঁওলি দে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top