দাও ফিরে সে ছেলেবেলা - শাঁওলি দে

দাও ফিরে সে ছেলেবেলা – শাঁওলি দে

EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে দাও ফিরে সে ছেলেবেলা – শাঁওলি দে রচিত আজকাল উত্তরণ-এ প্রকাশিত লেখাটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো – 

দাও ফিরে সে ছেলেবেলা – শাঁওলি দে : 

“দাও ফিরে সে ছেলেবেলা পাঠশালাতে নামতা পড়ি
বাদল রাতে গা ছমছম ,ভূতের গল্পে ভয়ে মরি
দাও ফিরে সে ছেলেবেলা ঘুম পাড়ানি গানের সুর
মা’এর কোলে ঘুমাক শিশু দস্যিপনা কোন সুদূর
দাও ফিরে সে ছেলেবেলা শীতের রোদে আচার চুরি
দাও ফিরে সে ছেলেবেলা দোলনা দোলাক বটের ঝুড়ি
দাও ফিরে সে ছেলেবেলা বোশেখ রোদে আমের বন
দাও ফিরে সে ছেলেবেলা ছোট্ট সোনার সবুজ মন …।”

দূর থেকে ভেসে আসছে শাঁখের আওয়াজ । সন্ধের লালচে আলো এসে চারপাশ মুড়ে দিয়েছে একেবারে। কানের কাছে পোঁ পোঁ সুরে এক নাগাড়ে ডেকে চলেছে মশা ,মাথার ওপর আরও লক্ষাধিক মশার দিশাহীন আনাগোনা। আরও বেশ কিছু ওপর দিয়ে এক ঝাঁক চিল এইমাত্র উড়ে চলে গেল বাড়ির দিকে ,ঠিক যেখান থেকে সকালে বেরিয়ে ছিল ওরা।
ছেলে মেয়েগুলোও ফিরছে বাড়িতে। ধূলোমাখা পা ,হাঁটু অবধি তোলা প্যান্ট , ঘামে জ্যাব জ্যাবে ফ্রক পড়া ওরা বাড়ির পাশের মাঠে বিকেলের খেলা সেরে ঘরে ফিরছে। যারা তখনো ফেরেনি , অপেক্ষা করছে মা’এর ডাকের , বাড়ি ফিরলেই তাদের কপালে জুটবে তালপাতার তৈরি হাত পাখার ডাঁটির বাড়ি ,তবু ওরা আর একটু খেলে নিচ্ছে , আর একটু …
বাড়ির পাশের মাঠ ,সবুজ গালিচে পাতা যেন। ওখানেই হা ডু ডু কিম্বা দাঁড়িয়াবান্দার ঘর কাঁটা। দূরে একটু সাইড করে বেশ কিছু জায়গায় আয়তক্ষেত্রের মতো মাপ করে ঘাস তুলে রাখা। ওভাবেই সাজানো হয়েছে ক্রিকেট খেলার পিচ। শীতকাল হলে দুটো বাঁশ পুঁতে বিকেলে ব্যাডমিন্টন আর রাতে বসবে ভলিবল খেলার আসর। চাঁদা তুলে বসানো হবে বেশি ওয়াটের বাতি।
মাঠের বাইরে রাস্তার ধারে পাঁচ ছয়টি বয়স্ক লোকও তাদের আসর জমিয়েছে। কোনোদিন লুডো ,কোনোদিন নির্ভেজাল তাসের আসর। জমজমাট আড্ডা। বাড়ি ফেরার তাড়া নেই ,তাড়া নেই অন্য কোনো কিছুর। পথ ভুলে যাওয়া একটা বড় চাঁদিয়াল গোত্তা খেতে খেতে ঠিক সেই মুহূর্তেই ওই আসরে এসে পড়বে। দৌড়ে আসবে ঘুড়ির মালিক ,পরম আদরে তুলে নেবে পরাজিত সৈনিককে , তারপর একছুট লাগাবে বাড়ির দিকে ,তৈরি করতে হবে আরও কড়া মাঞ্জা , যাতে আগামিকাল আজকের এই হারের শোধ তুলে নেওয়া যায় অনায়াসেই।
কিছু পরেই চারদিক থেকে গুনগুন করে ভেসে আসবে পাঁচালী পড়ার মতো প্রশ্ন উত্তর মুখস্থ করার আওয়াজ। কয়লার উনুনের ধোঁয়ার গন্ধ ভেসে বেড়াবে পাড়ার আনাচ কানাচ আর তারপর খোলা হাওয়ায় উড়ে বেড়াবে ফোঁড়ন ও কড়াই খুন্তির শব্দ। পাশের বাড়ি পুঁচকেটা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গেয়ে উঠবে সদ্য শিখে ফেলা স্বরবিস্তার ,আলাপ।
কিছু বছর আগেও পাড়া গাঁ’এ এভাবেই সন্ধে নেমে আসত। তখনও বিকেলের গায়ে লেগে থাকত মেঠো ঘামের গন্ধ , ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কলকাকলি। রাতগুলো ছিল নিশ্চিন্ত ঘুমের। পরিশ্রম ছিল কিন্তু তার সঙ্গে ছিল মানসিক শান্তি। যান্ত্রিক সুখ ছিল না ঠিকই কিন্তু যা ছিল তা এখনের চাইতে অনেক বেশি সুখের , অনেক বেশি আনন্দের।
কলকাতার মতো মেট্রো শহরের বাইরের যে পৃথিবীটা তা কিন্তু গত শতকেও অন্যরকম ছিল । গ্রাম তো বটেই জেলা শহরগুলোও বিশ্বায়নের কবলে পড়েনি তখনও। এই তো সেদিনও ছেলেবেলা মানে ছিল অহেতুক দৌড় ,গোল্লাছুট কিম্বা পুতুল খেলার ঘর। দেরি করে খেলে ফিরলে শাস্তিস্বরূপ জামা , প্যান্ট থেকে চোরকাঁটা বাছার কাজ। অথচ তাতেও কত উৎসাহ ! দিনগুলো চোখের নিমেষে কিভাবে যে বদলে গেল টেরই পাওয়া গেল না। এখন এসব ভাবতে বসলে মনে হয় যেন গতজন্মের কথা ! আজকালের ছেলেমেয়েদের এই আবেগ বোঝানো কঠিন।
যে মেয়েটা প্রায়ই অংকে একশ পেত তার পড়ার ঘরের তোষকের নিচে জমা থাকত প্রচুর প্রচুর তারিখ পেরোনো লটারি। স্মার্ট ফোনে গেম আপলোড নয় , নানা আকারের পাথর আর লটারি সংগ্রহ করাই ছিল তখন শখ । কারণ পাথরের ওপর পাথর সাজিয়ে পিট্টু খেলতে হবে তো ! হেরে গেলে অন্য দলের হাতে তুলে দিতে হবে জমিয়ে রাখা লটারি। উফ্‌ কী দামাল, দুরন্ত, নিষ্পাপ সেইসব সোনালি দিন। মনে পড়লেই নস্টালজিক হয়ে পড়তে হয়।
হইহুল্লোর খেলাধুলোর মতোই গল্পের বই পড়ার রেওয়াজও একটু একটু করে বদলে গেল ,তাই না ? মনে পড়ে সেই দিনের কথা ,যখন ভূগোল বইটার নিচে লুকিয়ে রাখা রাখত ‘আম আঁটির ভেঁপু’ কিম্বা ‘কাকুবাবু ও সন্তু’ ? দরজার দিকে এক চোখ রেখে পাতা উলটে পড়ে নেওয়া হত বহুপঠিত সেই বইগুলো। অন্য ঘর থেকে আসা আচমকা খুটখাট আওয়াজে মুহুর্তে বদলে যেত পড়ার ভঙ্গি । নিষ্পাপ মুখে দুলে দুলে আবার পড়তে হত মালভূমি কাকে বলে অথবা আকবরের জীবনী।
স্কুলের অফ পিরিয়ডই হোক বা ছুটির দুপুর গল্পের বই পড়া ছিল আবশ্যিক কাজ। এক বই পড়া শুরু করলে তা শেষ না করা পর্যন্ত তর সইত না। এভাবেই স্কুল জীবনেই পড়া হয়ে গিয়েছিল রবিনসন ক্রুশো থেকে শুরু করে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় অথবা কিছুটা শরৎ রচনাবলীও। ছোটবেলাতেই মুখস্থ হয়ে যেত ছোটদের রামায়ন , মহাভারত। বাড়িতে অতিথি এলে সম্পূর্ন ‘লালু ভুলু’ শোনানোও ছিল এক মজার ব্যাপার।
আর একটু বড় হতেই বাবা বা দাদু’র হাত ধরে লাইব্রেরিতে ভর্তি হতে হত আর সেই সঙ্গে মিলে যেত বহু নাম না জানা অচেনা বই’এর সুলুক সন্ধান। বই এনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফেরত দিয়ে আবার আগেই বেছে রাখা অন্য বই আনার যে উৎসাহ তা আজকের ছেলে মেয়েরা জানে না ।
আজকালের প্রজন্ম ছেলেমানুষী কী তাও জানে না। হঠাৎ বৃষ্টি এলে অংক খাতার পাতা ছিঁড়ে কাগজের নৌকা বানায় না ওরা। স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তায় গর্তে জমে থাকা জলে জোড়া পা’এ লাফিয়ে একে অন্যকে ভিজিয়ে দেওয়ার আনন্দ কি ওরা জানে ? অফ পিরিয়ডে রাফ খাতার পাতার পেছনে কাটাকুটি খেলা অথবা রাম ,শ্যাম ,যদু ,মধু, বা চোর পুলিশ খেলার স্বাদ ওরা পায়নি।
এই শতক প্রতি মুহুর্তে বদলাচ্ছে। অচেনা হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত। আগের সেই খেলার মাঠ এখন বদলে গিয়েছে। সবুজ ঘাসের এবড়ো খেবড়ো মাঠ এখন যন্ত্র দিয়ে ‘ট্রিম’ করা ; পাকা আধুনিক স্টেডিয়াম ঘিরে আছে চারপাশ। বাড়ির পাশে ফাঁকা মাঠে উঠেছে বড় বড় অট্টালিকা। বাড়িগুলো যেন একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আর এই প্রতিযোগিতায় আর কেউ না , হারছে আজকের প্রজন্ম।
জলপাইগুড়ি , কোচবিহারের মতো শহরই হোক কিম্বা শিলিগুড়ির মতো আধা মেট্রো শহর সব জায়গায় চিত্রটা একই। যে প্রবল গতিতে শহরের চরিত্র বদলাচ্ছে ছেলে মেয়েগুলোর মন মানসিকতাও ততই তাড়াতাড়ি পালটে যাচ্ছে। ইঁট ,কাঠ ,কংক্রীটের জঙ্গলে থাকতে থাকতে সেই রবার বল ছুঁড়ে পিট্টু খেলা কিম্বা পুতুলের বিয়ে দেওয়া ছেলে মেয়েরা কোথায় যেন হারিয়ে গেল ! আর কিছুতেই ওদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
শুধু জলপাইগুড়ি বা শিলিগুড়িই নয় কোচবিহারের প্রান্তিক অঞ্চল হলদিবাড়ির মতো আধা মফস্বল আধা শহরগুলোও কী দ্রুত বদলাচ্ছে তা ওখানে গেলেই টের পাওয়া যায়। পাড়ায় পাড়ায় বড় বড় ফাঁকা মাঠ ওখানেও এখন দূর্লভ। যে মাঠ জুড়ে কত ছেলেমানুষী ঝগড়া ,কত ছোঁয়াছুঁয়ি বা লুকোচুরি খেলার স্মৃতি লেগে আছে আজ সেখানে বড় কাঠের মিল। যাতায়াতের পথে চোখে পড়ে। অজান্তেই চোখের কোলটা ভিজে ওঠে , বুকটাও কি একটু হু হু করে ওঠে না ?
আমরা যারা নয়ের দশক ও এই দশকের একেবারে শুরুর দিকে একটু একটু করে বড় হচ্ছি তাদের কাছে এখনও এসব আবেগ মূল্যবান। সেসময়ও আমাদের ঘুম আসত ঠাকুমা’র ঘুম পাড়ানি গানে, গল্পের বই থাকত মাথার কাছে। পিঠের ব্যাগটা তখনও তেমন ভারি হয়ে ওঠেনি ,খেলাধূলো তখনও যান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। ছুটির দিনগুলো সেসময় কাটত এক বাড়িতে থাকা তুতো ভাইবোনদের খুনসুটিতে। কে আসল ভাই বা বোন বলে না দিলে জানাই হত না।
দেখতে দেখতে পরিবারগুলোও যেন কেমন ভেঙে গেল। নতুন শব্দ এল ‘নিউক্লিয়াস ফ্যামিলি’। ছোট্ট ছোট্ট সবুজ প্রাণগুলো ছেলেবেলা বোঝার আগেই হারিয়ে ফেলল মূল্যবান কিছু সময়। আজকাল ঠাকুমার বেসুরো গানের বদলে মোবাইল ফোনের গানে ঘুম আসে ওদের। নতুন কেনা গল্পের বই’এর পাতা উলটে দেখার সময় হয় না । দরকারে মোবাইল বা ল্যাপটপে চলে আসে পিডিএফ ফাইল। সত্যিকারের মুরগীর ডাক নয় ওদের ঘুম ভাঙে মোবাইলে ইন্সটল করা মুরগীর ডাকে। পিঠের ব্যাগটা ভারি হতে হতে এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে যে স্বাভাবিকভাবেই লাইন বাড়ছে অর্থোপেডিকের চেম্বারে।
এ কেমন যুগ ? এই যে খেলতে খেলতে সব পেয়েছির দেশে এসে পৌঁছালাম ,পেলাম তো সব ,হারালাম যা কিছু তার খবর কেউ রাখল ? আজ হাতের মুঠোয় বদলে যাওয়া এক পৃথিবী। গ্রাম হোক কিম্বা শহর বিশ্বায়ন সব জায়গায়। বড় বড় হোর্ডিং’এ ছেয়েছে আকাশ । শপিং মলের পর মল কেড়ে নিয়েছে দরদাম করে কেনাকাটার মজা। ফাঁকা যেটুকু জায়গা অবশিষ্ট পড়ে ছিল তা এখন ফ্ল্যাট বাড়ির কবলে। গলি থেকে রাজপথ সব জায়গায় বিশ্বায়ন ।
ছোট বড় সব শহরেই এখন খেলার মাঠের অভাব। ইচ্ছেমতো বাড়ির পাশেই খেলতে চলে যেতে পারে না কেউ। সকাল বিকেল ক্রিকেট বা ফুটবল খেলার ট্রেনিং হয় স্টেডিয়াম ঘেরা মাঠে। তবে বড় বেশি যান্ত্রিক সেই খেলা ,বড্ড মেকি ! বন্ধের দিনেও ফাঁকা রাস্তায় ক্রিকেট খেলায় মাতে না কেউ ,তার চেয়ে বরং নেট সার্ফিং’র ব্যস্ত থাকে। ঘাড় গুঁজে মোবাইলের বোতাম টিপতে টিপতে ওরা টেরই পায় না আস্তে আস্তে কখন ওদের হাতের মুঠো থেকে কী কী বেরিয়ে যাচ্ছে!
লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়ার তাগিদও কমে গেছে একেবারেই। প্রিন্টেড বই’এর চাইতে অনলাইন ম্যাগাজিন কিম্বা গ্যালারিতে সেভ করে রাখা ওয়ার্ড ফাইলের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বাড়ছে। গ্রামীন পাঠাগারে পাঠক কই ? যেসব টেবিলগুলোয় আগে ছেলেমেয়েদের ভিড়ে জায়গা হত না ,আজ সেখানে ধূলোর পরত। ছিন্নভিন্ন বই খুঁজে পাওয়া যায় না এখন। বইমেলায় কেনা বইগুলোতে নতুন গন্ধ লেগে থাকে।
ছোটদের পড়ার আগ্রহ কমছে তা বইমেলাগুলোতে ঘুরলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। কলকাতার কথা আলাদা ,জেলা বইমেলায় শিশু কিশোর বই বিক্রি তেমন হয় না বললেই চলে। গল্পের বই না কিনে ডিকশনারি কিম্বা গ্রামার বই কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করে সচেতন জনগন। আর গল্পের বই যদি কিনতেই হয় তবে বিদেশী লেখক ,যা পরবর্তীকালে বাইরের ঘরের আলমারিতে শোভা বাড়াবে। দেশীয় লেখকদের নামে সে জৌলুস কোথায় ?
ইতিহাস সাক্ষী কোনো সময়ই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সময় এগিয়ে যায় আর এগিয়ে যেতে যেতে সাপের খোলসের মতো রেখে যায় অসংখ্য স্মৃতি। এই স্মৃতি আঁকড়ে যারা বেঁচে থাকে সমস্যাটা হয় তাদের। তারা না পারে এই নতুন জীবন মেনে নিতে , না পারে পুরোনোকে টেনে ধরে রাখতে। বুদ্ধিজীবিরা তাদের গালভরা নাম দেন, ’জেনারেশন গ্যাপ’।
পৃথিবী এখন হাতের তালুর মুঠোয়। একটা বোতাম টিপেই সব কিছু হাতের সামনে চলে আসছে এখন। সবাই দৌড়াচ্ছে । একে অন্যকে তো বটেই নিজেকেও হারিয়ে দেওয়ার এ দৌড়। অথচ এ দৌড়ে আগের মতো স্থির কোন লক্ষ্য নেই। যত আমরা ফিনিশিং পয়েন্টের দিকে যাচ্ছি লাল ফিতেটা কে যেন আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে ,আরও দূরে। হাজার চেষ্টা করেও আমরা তা ছুঁতে পারছি না।
এমন একটা যান্ত্রিক জীবনই কি আমরা চেয়েছিলাম আমাদের ছেলেবেলায় ? এমনভাবে ক্লান্তিহীন দৌড়ই কি ছিল একমাত্র কাম্য ? না ,আমরা তা চাইনি। শুধু কমলালেবু’র মতো দেখতে পৃথিবী কখন যেন বদলে গেল ! চোখ খুলে দেখলাম আমরাও পালটে গিয়েছি পুরোপুরি। তবু আমাদের স্মৃতিতে যেটুকু পুরোনো দাগ লেগে আছে সেটুকুই আমাদের সম্বল ।
এই প্রজন্মের কিন্তু তা থাকবে না। কোনো সম্বল থাকবে না ওদের। নিঃস্ব হতে হতে ওরা শুধু ওপরে উঠবে। এত ওপরে যে নিচে তাকালে নিজের অস্তিত্বকেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মনে হবে।
তবু আশা জাগে একদিন আবার সেই পুরোনো সূর্যটা উঠবে , সেই চাঁদের দেশের চরকা কাটা বুড়িটার গল্প শুনতে শুনতে চোখ বুজবে ঠাকুমা’র কোলে শুয়ে থাকা ছোট্ট মেয়ে। দূরে নিশুতি রাতে পেঁচা ডেকে উঠলে মা বলে উঠবে ,ওই যে ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমীর গল্প হল শুরু। পুরোনো টায়ার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এবাড়ি ওবাড়ি দৌড়ে বেড়াবে ওই পাড়ার সানি ,রাজা ,বিকি ,পাড়ার মাঠে হাতের পাশে হাত রেখে ইকিড়মিকিড় খেলবে পিউ , লোপা আর মাম্পি আরও কত কে !
ফাঁকা ধূ ধূ মাঠের পাশ দিয়ে যেতে যেতে কারা যেন বলে উঠবে ,
’দোল দোল দুলুনি ,রাঙা মাথায় চিরুনি
বর আসবে এখুনি ,নিয়ে যাবে তখুনি। ’
এমন একটা দিনের স্বপ্ন আপনারা দেখেন না ,না ?

(প্রকাশিত, আজকাল উত্তরণ)

দাও ফিরে সে ছেলেবেলা - শাঁওলি দে

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top