ট্রাভেল ব্লগ বাই শাঁওলি দে – বীরাপ্পনের জঙ্গল ও মধুমালাইয়ের জঙ্গলে একদিন
বীরাপ্পনের জঙ্গল ও মধুমালাইয়ের জঙ্গলে একদিন – ট্রাভেল ব্লগ বাই শাঁওলি দে – ‘লং জার্নি’ প্ত্রিকায় প্রকাশিত, পড়তে ক্লিক করুন EKTUKROAKASH.IN এই ওয়েবসাইটে।
ট্রাভেল ব্লগ বাই শাঁওলি দে – বীরাপ্পনের জঙ্গল ও মধুমালাইয়ের জঙ্গলে একদিন :
সাউথ ইন্ডিয়া ট্যুরের একটা প্রধান অংশ ছিল উধাগামণ্ডলম বা উটি ভ্রমণ। সেই মতো নির্দিষ্টি দিনে আমরা মাইশোর থেকে উটি-মহীশূর রোড ধরে রওনা দিলাম। ড্রাইভার দাদার নাম ভোলে, ব্যবহার খুবই ভালো কিন্তু ওইদিকটায় যা হয়, ভাষা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। তবু ভদ্রলোক দুই চারটি ভাঙা ইংরেজি শব্দ জুড়ে জুড়ে আমাদের সঙ্গে জুড়ে থাকার চেস্টা করছিল, ওই আমাদের গাইড। তবে হিন্দি নৈব নৈব চঃ!
ভোর থাকতে থাকতেই আমরা রওনা দিয়েছি, ঘড়িতে সাড়ে ছটা বাজে তখন। পাহাড়ি সর্পিল পথ দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে তার নিজস্ব গতিতে। আমরা অতি উৎসাহী কয়েকজন জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে চলছি নতুন কোনো পথের সন্ধানে।
ভোলেদাদা এরপর ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসল, তারপর ভেঙে ভেঙে বলল, একটু পরই গাড়ি থামবে, ওখানে নেমেই খাওয়া দাওয়া আর অন্যান্য কাজকর্ম সেরে ফেলতে হবে। কারণ এরপর বেশ কয়েক কিলোমিটার গাড়ি থামানো যাবে না। আমরা ঢুকে যাব বীরাপ্পনের জঙ্গলে।
বীরাপ্পন! নামটা শুনেই যেন থমকে গেলাম সকলে। আমার বাবা একটু ভিতু মানুষ, মিনমিন করে বলে উঠলেন, অন্য রাস্তা-টাস্তা নেই উটি যাওয়ার? স্বভাবতই ভোলেদাদা, এই শুদ্ধ বাংলার একবর্ণও বুঝতে না পেরে নির্দিষ্ট একটা দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করালে আমরা বাবার কথাকে একেবারে পাত্তা না দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম।
আবার বোলেরোটা চলতে শুরু করল। ডুয়ার্স আমাদের বাড়ির কাছেই, এক আধবেলা ছুটি ছাটা পেলেও আমরা ডুয়ার্সে দৌড়াই। গরুমারা, লাটাগুড়ি, চিলাপাতা এসব দেখে আমাদের বড় হওয়া। তাই বন্দিপুর আর মধুমালাই নিয়ে যে আলাদা কোনো উত্তেজনা ছিল তা নয়, তবে বীরাপ্পনের নামটা শুনে শরীরের রোম খাঁড়া হয়ে যায়নি তা বলব না।
আমার হাতে ক্যামেরা, হাতি-টাতির যদি কালেভদ্রে দেখা মেলে তবে ছবি তুলব। সবাই জালানার দিকেই মুখ করে বসে আছে। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ল শাল, সেগুন, শিমূল, দেবদারু, আবলুস চন্দন গাছে মোড়া বিরাট বনভূমি শুনলাম এটাই বন্দিপুর ন্যাশনাল পার্ক। চারিদিকে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ, দুপাশে গাছপালা। আমাদের গাড়ি হু হু করে ছুটছে। আমদের ড্রাইভার দাদা ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ করে থাকার নির্দেশ দিল। আমরা তাঁর কথা মতো নিস্তব্ধে পেরিয়ে যাচ্ছি দস্যু সর্দার বীরাপ্পনের গহীন জঙ্গল। যেতে যেতে পথে চোখে পড়লো বন্য হাতির দলের নিঃশব্দে পেরিয়ে যাচ্ছে রাস্তার এপার থেকে ওপার। জায়গায় জায়গায় দলবদ্ধভাবে হরিণ ঘুরে বেড়াচ্ছে অবলীলায়। মনে পড়ল এটা ওপেন ফরেস্ট, তাই কালেভদ্রে নয় হামেশাই এনাদের দেখা পাওয়া যাবে। চিতা, বাইসন, প্যান্থার, ভল্লুক, বন্য কুকুর সবকিছুরই বাস এই বন্দিপুরে। নানা জায়গায় চোখে পড়লো ময়ুরের, সংখ্যায় তারা অগুনতি। আমাদের এদিকদার জঙ্গলের মতো এদের দেখা পাওয়ার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হয় না। তবে বাঁদরের অত্যাচারে জানালা খোলা রাখা যাচ্ছিল না। আমি গাড়ির ভেতর থেকেই একের পর এক দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করছিলাম ওখানেই দেখলাম ‘হাতি মেরে সাথী’সহ আরো কিছু সিনেমার শুটিং স্পট। জানলাম এটি ভারতের ব্যাঘ্র প্রকল্প ৯ এর সদস্য। ভালোলাগার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন একটা লাগছিল যখনই দস্যু সর্দারের কথা মনে হচ্ছিল। সব বাধা পেরিয়ে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল সেখানে সেইসব জায়গায় যেখানে বীরাপ্পন ও সঙ্গী সাথিরা ডেরা গেড়েছিল কোনো একসময়।
চোখ বুজে অনুভব করার চেস্টা করছিলাম সে দামাল দিনগুলোর কথা। ভাবছিলাম এইভাবে চলতে চলতে যদি হঠাৎই একদল দস্যু গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়! কী হবে তখন? আচ্ছা দস্যু সর্দারের দলবলের কেউ কি এখনও এই রহস্যময় জঙ্গলের আনাচেকানাচে লুকিয়ে নেই? থাকতেও তো পারে! হঠাৎ কি তারা দূর থেকে ‘হা রে রে রে রে’ করে হুংকার দিয়ে উঠবে?
কিন্তু তাতো হওয়ার নয়, এসব এখন স্বপ্নই। তাই আমরা বনভূমির বুক চিঁরে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে, নিরাপদেই। এখানে ওয়াচ টাওয়ারে বসে বন্য জন্তু জানোয়ার দেখা ও ছবি তোলা ছাড়াও হাতির পিঠে চড়ে বন-বিহারের ব্যবস্থাও আছে।
আমাদের হাতে সেইবারে সময় কম থাকায় আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল কর্ণাটক ছেড়ে তামিলনাড়ুর দিকে। কর্ণাটক-তামিলনাড়ু সীমান্তে কিছু সরকারি নিয়ম কানুন আছে। পরিচয় পত্র দেখানো, প্রয়োজনীয় সই সাবুদ সেরে আমরা প্রবেশ করলাম তামিলনাড়ুর জঙ্গলে, যেখানে এর নাম মধুমালাই।
বন্দিপুর আর মধুমালাইয়ের মাঠে রয়েছে ময়ার নদীর সীমারেখা। এই বনভূমির অংশ বিশেষ গেছে কেরলেও, ওখানে এর নাম উইনাদ। পথে সারি সারি হাতি, বাইসন, শম্বর, বার্কিং ডিয়ার, মাউস ডিয়ার। চিতা তো রয়েইছে, যদিও আমাদের ভাগ্য ভালো বলে অন্যান্য জন্তুদের দেখা মিললেও চিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটেনি। আমরা হাতিশালায় হাতি ও ময়ার নদীর জলপ্রপাত দেখার জন্য গাড়ি থেকে নামলাম। ছবি-টবি তোলা হল খানিকক্ষণ। এরপর আরো এগিয়ে চললাম সেগুন, চন্দন, ইউক্যালিপটাসের মাঝে নানা ধরনের পাখি কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। খালি চোখে যেটুকু দেখা যায় তা ক্যামেরাবন্দী করতে করতে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম জঙ্গল আমাদের অনেকবারই খুব কাছ থেকে দেখা। আসলে বন্দিপুর আর মধুমালাই না ঘুরে এলে বুঝতেই পারতাম না এক একটা জঙ্গলের চরিত্র, বৈশিষ্ট্য এক একরকম। মেলানোর চেস্টা বা তুলনা করা বৃথা।
ড্রাইভারের মুখেই শুনলাম নানাধরণের সাপও আছে এখানে। বন্দিপুরের মতো এখানেও বাঁদরের উৎপাত যথেষ্ট। বাঁদরের সঙ্গে আমার শত্রুতা সেই ছোটবেলা থেকে। তাই এদেরকে ক্যামেরা বন্দি না করে অন্যান্য ছবিতেই বেশি মনোনিবেশ করলাম।
বিশাল এই জঙ্গল জুড়ে অন্যান্য বনভূমির মতো গা ছমছমে পরিবেশ। যদিও তা আমরা খুবই উপভোগ করছিলাম। তবে ফেরার সময়টা ছিল সন্ধের পর। ভোলেদাদা সেই অন্ধকারে এমন জোরে গাড়ি ছুটিয়েছিল যে আমাদের সেই গতির জন্য, নাকি অচেনা জায়গার জন্য নাকি জঙ্গলের ভয়ানক পরিবেশের জন্য এত ভয় করছিল যে আজও সেই সময়টুকুর কথা কল্পনা করলে শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে।
অঞ্চলটি বাসে ও ঘুরে দেখা যেতে পারে। তবে নিজস্ব রিজার্ভ গাড়িতে গেলে ইচ্ছে মতো নিরাপদ জায়গায় হুটহাট দাঁড়িয়ে পড়া যাবে। মধুমালাইয়ের রিসেপশন সেন্টার ‘টেপ্পাকাডু’তে যোগাযোগ করে হাতির পিঠে বনবিহার করাও এই জঙ্গলমহল দর্শনের একটা খুবই উপভোগ্য বিষয়। তবে আমরা চলতে চলতে এত জন্তু চাক্ষুস করছিলাম যে আর আলাদাভাবে বনবিহার করার প্রয়োজন বোধ করিনি। মন ও ক্যামেরা ভরে নিয়ে এসেছিলাম গুচ্ছ গুচ্ছ স্মৃতি। এরপর আমাদের গাড়ি ছুটে চলল আমাদের পরবর্তী গন্তব্য উধাগামণ্ডলমের দিকে। সে গল্প অন্য আরেকদিন।
কখন যাওয়া যাবেঃ নভেম্বর থেকে মে মাসই এখানে আসার পক্ষে উপযুক্ত। তবে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে আবহাওয়া খুবই ভালো থাকে। বর্ষাকালটা এড়িয়ে চলাই ভালো হবে।
কিভাবে যাওয়া যাবেঃ মাইশোর থেকে উটির দূরত্ব ১২৬ কিলোমিটার। ডাইরেক্ট বাসও চলে এই রাস্তায়। সময় লাগে প্রায় চারঘন্টা। তবে মাইশোর থেকে উটি যাওয়ার সবচাইতে সহজ উপায় হল নিজস্ব গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া। সময়ও কম লাগে। এই রাস্তার মাঝেই পরে বন্দিপুর ও মধুমালাই জঙ্গল। মাইশোর থেকে বন্দিপুর ৭৬ কিলোমিটার, সময় লাগে আড়াই ঘন্টা, আরও ১৫ কিলোমিটার জঙ্গল ধরে এগোলেই মধুমালাই অরণ্য। বন্দিপুর ও মধুমালাই ভ্রমণ করে মাইশোরেও ফেরা যায় বা চলে যাওয়া যায় সরাসরি উটিতে। বাসে গেলেও দিনে দিনে ফিরে আসা যায় মাইশোরে।
কেউ যদি ব্যাঙ্গালুরু থেকে যেতে চায় সেটাও করা যেতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে সময় লাগে অনেকটাই বেশি, প্রায় ৭ ঘন্টার মতো।
কোথায় থাকা যাবেঃ বন্দিপুরে থাকা ও বনবিহারের জন্য রয়েছে প্রচুর হোটেল ও ডর্মিটরি, কটেজ আছে প্রচুর। এখানকার বিশদ তথ্যের জন্য যোগাযোগ করা যেতে পারে (০৮২২৯) ২৩৬০৪৩ এই নম্বরে।
মধুমালাই বন্য জন্তু অভয়ারণ্যে গেলে টেপ্পাকাডুতে থাকাই ভালো। এখানে বনবিভাগের রিসেপশন সেন্টার আছে।
দূরভাষঃ (০৪২৩) ২৫২৬৫৮০। এছাড়াও অরণ্য লাগোয়া সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তীর চল্লিশ ঘরের রিসর্টেও থাকা যেতে পারে, যা অনেকটাই পিরামিডের মতো দেখতে।







