হারিয়ে যাওয়া উৎসব – ১
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রথা, আচার, পূজা-পার্বণ যেগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে, সেসব নিয়ে শাঁওলি দে-র বিভিন্ন নিবন্ধ, যা নানা পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত, তার একটি ( হারিয়ে যাওয়া উৎসব – ১ ) হারিয়ে যাওয়া ‘কাঠাম উৎসব’ পড়ুন EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে।
হারিয়ে যাওয়া উৎসব – ১ :
গত কয়েক বছরে প্রায় ম্যাজিকের মতো কিছু প্রাচীন প্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। এমনই এক প্রথা বা উৎসবের কথা আজ জানাবো। চৈত্র সংক্রান্তির দিনে হওয়া এই বিলুপ্তপ্রায় প্রথার কথা সকলে প্রায় ভুলতেই বসেছে।
কাঠাম উৎসব। কারো কারো কাছে নামটা নতুন ঠেকলেও পুরোনো মানুষদের মুখে এই উৎসবের কথা আজও শুনতে পাওয়া যায়। যদিও নতুন প্রজন্মের কাছে এই প্রথা অজানা, অচেনা।
কোচবিহার জেলা ও তার অন্তর্ভুক্ত সব জায়গাতেই এমন কিছু রীতি নীতি উৎসব আছে যা আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। চৈত্র সংক্রান্তির উৎসবগুলো তার মধ্যে অন্যতম। পিঠে পিন ফুটিয়ে চড়ক উৎসবের কথা তো অনেকেই জানে। এই চড়কের সময়েই সংক্রান্তির এক দু’দিন আগে থেকে উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে কোচবিহার জেলার বেশ কিছু জায়গায় পালিত হয় এই কাঠাম উৎসব। ইদানিং অবশ্য অন্যান্য আরও অনেক কিছুর মতো এই উৎসবও হয় হাতে গোনা জায়গায়।
কাঠাম অর্থ্যাৎ কাঠ বা বাঁশ দিয়ে তৈরি আধার বা ফ্রেম। গাজনের সময় গ্রামের শিল্পীরা বিভিন্ন ঠাকুরের সাজ সেজে নৃত্য গীতে মেতে ওঠে। কখনো কালী, কখনো দূর্গা বা রাধা কৃষ্ণের আদলের সে সাজে উঠে আসে পৌরাণিক কাহিনী কিম্বা গ্রাম গঞ্জের নিজস্ব রীতিনীতি। অনেকটাই বহুরূপীর মতোই।
নমঃ শিবায়ঃ সর্বদুঃখহরণকারী, এসো এসো ভোলেবাবা ত্রিলোচনকারী- এই গানের মাধ্যমেই শুরু হয় কাঠাম নৃত্য। অসুর বধ কিম্বা রাবণ বধের কাহিনীগুলোই এই কাঠাম মৃত্যের জন্য সবচাইতে জনপ্রিয়। এটি রাজবংশী সমাজের একটি লোকাচার। শুধু ভক্তিমূলক গানই নয় সমাজের নানা সমস্যার কথাও এই লোকাচারে উঠে আসে যেমন বন্যা, দুর্ভিক্ষ এমনকি ছিটমহলের কথাও।
কাগজের কাঠামের অদ্ভুত দেখতে পোশাকে সজ্জিত হয়ে, কেউ কেউ আবার কোনো ঠাকুরের ভূমিকায় ঢাক, ঢোল, করতালের সঙ্গে নেচে উঠছে আর দর্শকদের সামনে তুলে ধরছে এক টুকরো অতীত।
যদিও এখন শিল্পীরা এখন এই কাজে উৎসাহ হারাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের কথায় জানতে পারা যায়, সারা বছর সংসার চালানোর টাকা জোগাড় করতে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়, থাকে চাষাবাদ। এই কাঠাম নৃত্য করতে গেলে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা তুলতে যেতে হয়, ফলে কাজের ক্ষতি তো হয়ই, এতে কোনো আয়ও নেই। ফলে শিল্পীরা কেন করবে এসব? তাছাড়া পুরোনো কাঠাম শিল্পীরা অনেকেই মারা গেছেন, কেউ বয়সের ভারে ক্লান্ত কেউ বা অসুস্থ। তারাও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই শিল্প তেমন ভাবে তুলে ধরতে পারেননি, জাগাতে পারেননি কোনো আগ্রহ।
এই সুন্দর উৎসব এখন অল্প কয়েকজন মানুষের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে আছে। যতদিন সেটুকু থাকে ততদিনই লাভ। তাই নয় কি?







