ডায়েরি-থেকে-ছেঁড়া-কয়ে

ডায়েরি থেকে ছেঁড়া কয়েকটি পাতা …

শাঁওলি দে-র লেখা ব্যক্তিগত গদ্য ডায়েরি থেকে ছেঁড়া কয়েকটি পাতা প্রকাশিত হল EKTUKROAKASH.IN  এই ওয়েবসাইটে 

ডায়েরি থেকে ছেঁড়া কয়েকটি পাতা :

 

শরীর খারাপ হলে ওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মনটাও খারাপ হয়ে যায় আমার। বার বার পুরোনো কিছু ক্ষত যা এতদিনে শুকিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তা আবার একটু একটু করে জানান দেয় তার অস্তিত্ব। রাতভর চলে হিসেব নিকেশ যা কিছু পাইনি তার।

অথচ পেয়েছিও তো কতকিছুই দ্যাখো ! এই যে এত শরীর জুড়ে তীব্র উষ্ণতা তাকে ছাপিয়ে গিয়েছে কিছু উষ্ণতম সম্পর্ক কই তাদের কথা তো মনে পড়ে না। আনন্দের সেসব মুহূর্ত যা আমার যাপনের সঙ্গে লেপ্টে থাকে রোজ সেসবও কেমন ফিঁকে হয়ে আসে।

জ্বরের সময় আমি কখনো নিজেকে খুঁজতে বের হই। অন্ধকারের থেকে আলোর দিকে যাওয়ার চেষ্টায় মাতি আবার আলোর থেকে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াই একটু একটু করে। কখনো দিশেহারাও হই, তারপর খড়কুটো পেয়ে আঁকড়ে ধরি ওপরে ওঠার চেষ্টায়।

আজকাল এইসবই আমার প্রলাপ। ছোট্টবেলার সেই আবোলতাবোলের বদলে ইদানিং হাবিজাবি কাটি খাতার পাতায়, মোবাইলের নোট প্যাডে। জ্বরের ঘোরে চোখ বুজে থাকি অনন্তকাল, তারপর সেই ঘন কালো অন্ধকারের মধ্যেই ভেসে ওঠে ছোটবেলার সেই কড়িকাঠ গোনার ছাদ, অসম্পূর্ণ একটা ঘর, প্লাস্টিকের নিচে মাথা আর ঠান্ডা জলে মাথা ধোওয়ার শব্দ। কপালের কাছে ভাঁজ করা একটু কাপড় তাতেও লেগে থাকত উষ্ণতা , আর্দ্রতাও। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় টের পেতাম স্টিলের গ্লাসে বার্লি গুলোচ্ছে বাবা। মা কানের কাছে মুখ এনে বলছে, রাতে লুচি খাবি ?

আজকাল জ্বর এলে এসব ভাবি। ফোনের ওপারের দুটো বয়স্ক মুখকে জানান দিই না শরীরের খবর। বরং গলা স্বাভাবিক রেখে ওদের ওষুধের খোঁজ খবর নিই, তারপর বলে উঠি, সাবধানে থেকো।

আসলে নিজেকেই শোনাই বোধহয়। তাই সবার ভালো থাকার খবরে একটু একটু করে ভালো হই, জ্বরহীন হই। উষ্ণতা কমিয়ে ফেলি।

বালিশটাকে আঁকড়ে ধরে আবার স্মৃতিমেদুরতায় মেতে উঠি। কিছু হাসি, কান্না, ভয়ের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ভেসে বেড়ায়। মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। ছোটবেলা, কিশোরীবেলা, যুবতীবেলা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। দৃশ্যগুলোকে পরপর সাজাই আমার খেয়াল খাতাতে। নিজের মনেই হেসে উঠি, কখনো বা দু’চোখ ভরে ওঠে জলে।

দৃশ্য-এক
সবে ক্লাস ফাইভ।নতুন স্কুল যাওয়া শুরু হয় নি।প্ল্যান হল দার্জিলিং যাওয়া হবে। আমরা চারজন সঙ্গে আরো জনা ছয়েক। উত্তেজনায় ভরপুর. . .দ্বিতীয় দিন গন্তব্য মহাকাল।তখনও শৈশব কাটেনি; দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে প্রায় দলছুট. . .তাড়া খেলাম একদল হনুমানের। দিশেহারা হয়ে উল্টোপাল্টা ছুটছি। ভিড় জমে গেছে।সবাই থামতে বলছে…কে শোনে কার কথা !

সামনে সুবিশাল খাদ। আমি দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য…পড়ব পড়ব হঠাৎ কোত্থেকে আমার বাবা মাটি খামচে টামছে উপরে উঠে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল খাদের সামনে থেকে।আবছা মনে আছে সবাই বলছিল সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলাম।তারপর বহুবার বহু জায়গায় ঘুরতে গেছি।হনুমানের ভয় আমার
আজও কাটেনি। মথুরা বৃন্দাবনের মতো বহু জায়গায় মন্দিরের ধারে কাছে যাইনি। গাড়িতে বসে থেকেছি।

দৃশ্য-দুই

কলেজ সেকেন্ড ইয়ার।পুজো পেরোলেই পরীক্ষা।তারপর দিদির বিয়ে। প্রিপারেশন ঠিকঠাক,চিরকালই স্টেজে মারার অভ্যেস।সারাবছর বিন্দাস বিন্দাস ভাব।বাড়িতে লক্ষ্মী পুজো…কোজাগরী, অনেক রাতে।সন্ধ্যে থেকে আলপনা, পুজোর আয়োজন খিচুড়ি রান্না সবেতেই নাক গলাচ্ছি [মন্টমরেন্সিকে মনে আছে?] আবদারে হবু জামাইবাবু নিয়ে এসেছে বুড়িমা আর তুবড়ি।রাস্তা ব্লক করে ফাটাচ্ছি।একাই একশ।বোমের পর তুবড়ি, তুবড়ির পর বোম।জলভাত। শেষের দিকে একটা তুবড়ি বিশ্বাসঘাতকতা করল।দিদি বা জামাইবাবু ঠিক মনে নেই এখন ! কেউ একজন ওটা পা দিয়ে পাশের ড্রেনে ফেলে দিতে চাইল। আমি চোখের নিমেষে সেটা হাতে তুলে নিয়ে ঝাঁকাতে লাগলাম। যেন ঝাঁকালেই কারনটা ধরতে পারব।সত্যিই ব্যাটা এমনি বিশ্বাসঘাতকতা করল যে হাতেই ফেটে গেল স্বগৌরবে। ডানহাত পুড়ে ছাড়খার; তারপর সেই হাতের কি হাল হল, তা না লিখলেও চলবে।আজও কিছু জায়গা তার সাক্ষী বহন করছে। ইদানীং তো দেশলাই কাঠি জ্বালালেও পাঁচ বার ভাবি। মুখটা বেঁচেছে এই না ঢের; ওই ঘটনার পর সবাই আমার উদাহরণ দিতে লাগল-এটাও একটা পজিটিভ দিক বটে !

দৃশ্য-তিন

তখন বেশ ছোট। মা আর দিদিভাই মেঝেতে বসে মটরশুটি ছুলছে। আমি যথারীতি ওখানে হাজির।ছুলছিলামই বোধহয়, হঠাৎ কখন সকলের অলক্ষ্যে নাকের মধ্যে একটা মটর ঢুকিয়ে বসে আছি। আমায় চুপচাপ দেখে মায়ের কেমন সন্দেহ হল।তাকাতেই ঘটনা বলে ফেললাম।শুরু হয়ে গেল চিৎকার চেঁচামেচি …যত সবাই নাক ঝাড়তে বলে আমি ততই নাক টানি। মটর ঢুকে একেবারে স্বর্গের দোরগোড়ায়, ব্যস তারপর প্রতিবেশিদেরকে সাহায্যে সোজা হাসপাতাল… অনেক চেষ্টা, টানাপোড়েনের পর তিনি বেরিয়ে এলেন অবশেষে। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল,আমিও।

দৃশ্য-চার

যোধপুর। ২০১২।

গন্তব্যঃ জয়সলমীর।ট্রেনঃযোধপুর-জয়সলমীর এক্সপ্রেস। বাবু, মা, দিদিভাই, জামাইবাবু, ভাগ্নে আর আমরা দু’জন। কম বেশি সবাই বোদ্ধা।যদিও কেউ স্বীকার করে না, আমিও না।হোটেল ছেড়ে দেওয়ায় সন্ধ্যে থেকে স্টেশনের রেস্টরুমে বসা। ট্রেন রাত দশটায়। ঘোরা,মার্কেটিং, খুচখাচ খাওয়াদাওয়া সবই চলছে।তখনো জানি না কত নম্বর প্লাটফর্মে ট্রেন দেবে। আটটা বাজতেই বাবা তাড়া লাগাল, ‘এক এক করে রাতের খাবার খেয়ে আয়’-আর আমরা বলছি আরে দেরি আছে।পৌনে নটার দিকে যখন জানলাম প্লাটফর্ম নং…এর ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করেই ডিনার করতে ছুটলাম। কারণ আমরা যেখানে ছিলাম, প্লাটফর্ম তার চেয়ে অনেক দূরে। কোনো রকমে খাওয়াদাওয়া সেরে যখন নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালাম তখন সাড়ে নটা বেজে গেছে।পৌঁছেই দেখি লাইনে ট্রেন।জামাইবাবু আর আমার বর কামরা নম্বর খুঁজে টুজে জানালো ওই যে ওখানে আমাদের সিট। আমরা এগোচ্ছি, হঠাৎ খেয়াল করলাম দিদিভাই একজনকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করছে এই ট্রেনের নম্বর
কি এটা ? লোকটা কি বুঝল জানি না, উত্তর দিল হা। কেমন একটা খটকা লাগল।ছেলেদের বল্লাম ট্রেন নম্বরটা মিলিয়েছ তো তোমরা?
-‘হ্যাঁ,হ্যাঁ,ওঠ তো।’
আমরা বললাম কামরার গায়ে নামের লিস্ট কই।’ওরা বলল..চাপ নিস না।অনেক সময় দেরিতে লিস্ট টানায়।’চড়ে বসলাম সক্কলে। ওঠা মাত্র ট্রেন ছেড়ে দিল।ঘড়িতে তখন পৌনে দশ।আমরা অবাক।ট্রেন আবার before time ছাড়ে নাকি।সুব্রত (আমার বর)বলে উঠল আরে সান্টিং হচ্ছে।বাবাও ইতিমধ্যে ঘাবড়ে গেছে।তবু ওরা বলে চলছে আরে এটাই ট্রেন রে’..আসল বিপত্তি ঘটল এর পর।সিট নম্বর দেখে যেই না বসতে গেছি দেখি ওখানে আগের থেকেই লোক বসা।শুরু হল অহেতুক তর্কাতর্কি; বুঝলাম বেগতিক।ভুল করে একেবারে উল্টো দিকের ট্রেন এ উঠে পরেছি।আসলে আমাদেরটা আর এই ট্রেনটা পিঠোপঠি দাঁড়িয়ে ছিল। দু’জন দু’দিকে মুখ করে।

ব্যস এরপর আরকি ! হুলুস্থুল পড়ে গেল।কিছুতেই ট্রেনটা মিস করা চলবে না।সব প্ল্যান করা।ট্রেন নিজের গতিতে ছুটছে।ধরলাম টিটি। বলল এখন চেন টেনে লাভ নেই।পরের স্টেশনে নামুন।সেখান থেকে ব্যবস্থা করুন কিছু।’ অনুরোধে তিনি ফোনও করলেন যোধপুর স্টেশনে যদি ট্রেন দেরিতে ছাড়ানোর কথা বলা যায় !আমরা দিশেহারা… দাঁড়িয়ে আছি ট্রেনের কামরার মুখে। ট্রেন থামল সুধানিতে।তখনও ফোনগুলো ওতটা স্মার্ট ছিল না। নেট সার্চ করা অসুবিধাই ছিল।
একদম উল্টো দিক।রাত সাড়ে দশ।ছোট গ্রাম।শুনশান।রাস্তায় মাতাল ছেলে ছোকরা । স্টেশনও ফাঁকা; পরবর্তী ট্রেন সকাল আট। বিচ্ছিরি মানসিক অবস্থা। দুই ভায়রা দুই দিকে খোঁজ করতে ছুটল। আমরা মাঝপথে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ; হঠাৎ নজরে পড়ল একটা মাল বোঝাই টেম্পো।দিদি আর আমি সাহস করে পথ আটকালাম।বল্লাম সব ঘটনা।পরিস্কার বলে দিল ‘কভি নহি পাকড় সকোগে। ‘আমাদের তো হাতে পায়ে ধরার মত অবস্থা..বাবা বেশি টাকা দেবার কথা বলায় রাজী হলেন। এর পরের আধঘণ্টা একেবারে ‘jab we met’..মা ড্রাইভারের পাশে। আর আমরা সবকটা টেম্পোর পেছনে বড় বড় বস্তার মাথায়।তীব্র গতিতে ছুটে চলল গাড়ি। তীব্র উত্তেজনা; জানি ট্রেন পাব না…তবু ওই যে কথায় বলে না আশায় বাঁচে চাষা !

পৌঁছালাম যোধপুর স্টেশন।ঘড়ির কাঁটা রাত ১১টা ছুঁই ছুঁই…স্টেশনের ভেতরে গাড়ি ঢোকে না।নামিয়ে দিল বহুদূরে, বেশ ক’টা প্লাটফর্ম পেরিয়ে যেতে হবে আমাদেরটায়।প্রচুর লাগেজ (এটা আমাদের বরাবরই লিমিট ক্রস করে)…ছুট লাগালাম।এখন ভাবলে অবাক লাগে আমার মা ওইরকম অস্ট্রিও আর্থাইটিসের পা নিয়ে আর ছোট ভাগ্নেকে বগলদাবা করে কিভাবে সেদিন দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটেছিলেন।ছুটতে ছুটতে ঠিক যখন নির্দিষ্ট প্লাটফর্মে প্রবেশ করলাম আমাদের অবাক হওয়ার পালা শেষ হয় নি।প্লাটফর্মে দেখি দাঁড়িয়ে যোধপুর-জয়সলমীর এক্সপ্রেস।জানলাম ট্রেন সেদিন প্রায় ঘন্টা দুই লেট।ছাড়বে রাত বারোটায় ; আমাদের ঘড়িতে তখন বারোটা বাজতে আরো পনের মিনিট।

রাজস্থান সফরে জয়সলমীরের ট্রিপটা সবচেয়ে সুন্দর ছিল।

এই সব কত আবোলতাবোল কথা, যদিও সত্যি তবু এখন আবার যখন মনে পড়ে বা ডায়েরির পাতা ওল্টাই হাসিই পায়।
এবার এসবই রইল পাঠকের দরবারে, আমার এই খেয়াল খাতায় লেখা কথাগুলো কি কারোর ভালো লাগবে না ?

(প্রকাশিত, শিলাদিত্য পত্রিকা)

ডায়েরি-থেকে-ছেঁড়া-কয়ে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top