ঐতিহ্যকে যত্ন করতে হয়, কখনোই মুছে ফেলা যায় না – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে ঐতিহ্যকে যত্ন করতে হয়, কখনোই মুছে ফেলা যায় না – শাঁওলি দে -র কলমে –
ঐতিহ্যকে যত্ন করতে হয়, কখনোই মুছে ফেলা যায় না – শাঁওলি দে :
হলদিবাড়ি, যার গায়ে লেগে আছে অনেক প্রাচীন ইতিহাস। অতীত মুছে গেলেও যাওয়ার সময় কিছু তো ছাপ রেখেই যায় আর সেই ছাপ ধরেই চলে আমাদের এগিয়ে যাওয়া, পথ চলা।
হলদিবাড়িকে খুব যত্ন করে প্রান্তিক শহর নামে ডাকা হয়। কারণ এর এক পাশে বাংলাদেশে সীমান্ত বর্ডার পুরোটা এলাকাটিকে প্রতিবেশী দেশের থেকে বিযুক্ত করেছে। বর্ডার এলাকা বলে এর নাম যেমন সকলের কাছে পরিচিত, ঠিক তেমনই একসময় বিপুল পরিমাণে হলুদ আর তামাক চাষের জন্য হলদিবাড়ি জনপ্রিয় ছিল। তবে সেই গল্প এখন কিছু পুরোনো মানুষের মুখের গল্পই হয়ে রয়ে গিয়েছে। বর্তমানে হলদিবাড়ি নামক এই আধা মফঃস্বল শহরটি টমেটো আর কাঁচালঙ্কার জন্য প্রসিদ্ধ।
হলদিবাড়ি একটা দ্বীপের মতো, একপাশে বর্ডার তো অন্য পাশে তিস্তা নদী। এই তো কিছু বছর আগে পর্যন্তও হলদিবাড়ির থেকে এর জেলা শহর কোচবিহার ও মহকুমা শহর মেখলিগঞ্জ যাতায়াত ছিল খুবই কষ্টকর৷ নদী পেরিয়ে যাওয়া ছিল পরিশ্রমসাধ্য। কিন্তু বর্তমানে জয়ী সেতু তৈরি হওয়ায় সমস্যা অনেকটাই কমে গিয়েছে। দূরত্ব কমেছে দুই পক্ষেরই।
একদিকে এই সমস্যার সমাধান অন্যদিকে দার্জিলিঙ মেইলে সরাসরি কলকাতা যাওয়ার পথ দুটোই খোলা থাকায় ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে যেমন সুবিধে হয়েছে তেমনই হলদিবাড়ি তো বটেই কোচবিহার, ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়িসহ চ্যাংড়াবান্ধা-মেখলিগঞ্জের সমস্ত নাগরিকদের হলদিবাড়ি এসে দার্জিলিঙ মেইল ধরে মালদা-বর্ধমান ও কলকাতা যাওয়া সহজসাধ্য হয়েছে৷
দেশভাগের আগে থেকেই এই রেলপথ ছুঁয়ে যেতো দার্জিলিং মেইল ট্রেনটি।শিয়ালদহ-রানাঘাট-ভেড়ামারা-হার্ডিঞ্জ ব্রীজ-ঈশ্বরদী-সান্তাহার-হিলি-পার্বতীপুর-নীলফামারী-হলদিবাড়ি-জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি স্টেশনগুলি।
দার্জিলিং মেলের বিখ্যাত যাত্রীরা হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভগিনী নিবেদিতা, বিপ্লবী যতীন দাস, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, রাজেন্দ্র প্রসাদ, পদ্মজা নাইডু, আসরাবুদ্দিন,বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সহ বহু রথি-মহারথি।
১৮৭৮ সালে চালু হওয়া সেই রেলপথটি আজও আছে। মাঝে কিছু বছরের জন্য বন্ধ হলেও এই ঐতিহ্যবাহী ট্রেনটির দুইটি কোচ কলকাতার জন্য আবার হলদিবাড়ি স্টেশনে দেওয়া হয়েছিল। তাতেও অসুবিধে কিছু হত না।
পরে ২০২২ সালের ১৫ই আগষ্ট থেকে পাকাপাকিভাবে এই ট্রেনটি হলদিবাড়ি থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দেয়, প্রতিদিন, যা হলদিবাড়িবাসীর কাছে সুবিধে তো বটেই গর্বেরও কিছু কম নয়।
সন্ধে ছটা পনেরয় সব কাজ মিটিয়ে দার্জিলিং মেইল ধরে পরদিন সকালে কলকাতা পৌঁছানো এবং সেখানে সারাদিন কাজ মিটিয়ে আবার রাত ১০টায় ট্রেন ধরে সকালে হলদিবাড়ি পৌঁছানো এখানকার ব্যবসায়িকদের কাছে যে কতটা লাভজনক তা, তারাই জানে। এমনকি ফিরতি পথে এনজেপি, জলপাইগুড়ি থেকে বহু ডেইলি প্যাসেঞ্জার নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল কিম্বা অন্যান্য অফিস ধরতে পারে।
কিন্তু বর্তমানে আবার রাজনৈতিক চাপান উতোরে কিম্বা অন্য কোনো অজানা স্বার্থে আবার দার্জিলিং মেইল হলদিবাড়ি থেকে সরানোর কথা জানা যাচ্ছে। তাতে কতটা সত্য কতটা গুজব তা নিয়ে এখনো দ্বন্দে হলদিবাড়িবাসী। তবে দার্জিলিঙ মেইল আবারও অন্য পথগামী হলে তা একদিকে যেমন হলদিবাড়ির প্রাচীন ঐতিহ্যের গায়ে হাত পড়বে, তেমনই ব্যবসায়িক ও যারা বিভিন্ন কাজে হলদিবাড়ি-জলপাইগুড়ি থেকে (বিশেষ করে রুগী, ছাত্র ছাত্রী) কলকাতা যান তাদের আবার হয় জলপাইগুড়ি রোড কিম্বা এনজেপি হয়ে কলকাতাগামী ট্রেণ ধরতে হবে, যা পরিশ্রমসাপেক্ষও সেই সঙ্গে সময়ও বেশি খরচ হবে।
তবে এর চাইতেও বেশি খারাপ লাগবে যেটা তা হল একটা ইতিহাস পুরোপুরি মুছে যাবে হলদিবাড়ির পাতা থেকে, এ কি কোনোভাবেই কাম্য?







