'এ এক ভয়ঙ্কর সময়' - শাঁওলি দে

‘এ এক ভয়ঙ্কর সময়’ – শাঁওলি দে

‘এ এক ভয়ঙ্কর সময়’ – শাঁওলি দে – এই সময়ের ওপর লেখা EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে শাঁওলি দে-র একটি নিবন্ধ :-

‘এ এক ভয়ঙ্কর সময়’ – শাঁওলি দে : 

 

ঠিক কবে থেকে সব কিছুই অন্যরকম হয়ে গেল তা এখন আর মনে পড়ে না। তবে হঠাৎ একদিন চোখ খুলতেই দেখা গেল বদলে গিয়েছে সব। ঠিক যেমন করে রিপ ভ্যান উইঙ্কল একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল এগিয়ে গিয়েছে কয়েক’শ বছর। মুহূর্তেই চোখে পড়েছিল একটা গোটা পৃথিবী অন্যরকম।

বর্তমানে আমরা এক অদ্ভুত অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কয়েক মুহূর্ত আগেও যা ছিল আন্তরিক, কোমল আজ তা যান্ত্রিক, কঠিন। মাৎস্যানয় বুঝি একেই বলে!
আসল কথাটা হল শিক্ষা, যা এখন তেমন কোনো জরুরি বিষয় নয়। পরীক্ষা ব্যবস্থায় পাশ ফেল না থাকার কারণে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে আগের মতো পাশ করে নতুন ক্লাসে ওঠার তাগিদ দেখা যায় না। ফলে পড়াশোনাটা কবে থেকে যেন মুখ্য থেকে গৌণ হয়ে গেল! আর এই মৃত পরীক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটা গাঁথল কোভিডের মতো ভয়ঙ্কয় এক ভাইরাস। আড়াই বছর পর স্কুল খুললে দেখা গেল একটা প্রজন্ম সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে জীবনের দৌঁড় থেকে।

স্মার্ট ফোন এখন সহজলভ্য। বয়স নির্বিশেষে সকলের হাতের মুঠোয় উঠে আসা এই অদ্ভুত এক যন্ত্র যেমন পুরো পৃথিবীকে চোখের সামনে এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনই সকলকে নিয়ে গিয়েছে অন্য এক জগতে। যে জগতে কেউ নেই, সেখানে সে একা, একদম একা।
স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা একটা পুরো প্রজন্মকে চোখের নিমেষে শেষ করে দিয়েছে। ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন আয় করাও খুব একটা কঠিন বিষয় নয়, অন্তত পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর থেকে তো অনেকটাই সহজ। লাগবে শুধু লক্ষ লক্ষ ভিউস, আর অসংখ্য লাইক, কমেন্ট আর সেয়ার। কনটেন্ট হিসেবে একটা কিছু বানালেই হল, যদিও বেশ কিছু ভ্লগার খুব ভালো কাজ করে চলেছেন, কিন্তু বেশিরভাগই দেখার মতো নয়। যত বেশি অশ্লীল ভিডিও, তত বেশি ভিউস, তত বেশি টাকা। ফলে এই প্রজন্ম অযথা এত পরিশ্রম করবেই না কেন!

পুরোনো দিনের মতো বিকেলবেলা পাশের মাঠ থেকে খেলাধূলার চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে আসে না কতদিন! হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, চু-কিত-কিত এখন অতীত। অবশ্য মাঠের আকার আয়তনও এখন কমতে কমতে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। যাওয়া আসার পথে বেশ কিছু ছেলে মেয়েকে দেখা যাক একসঙ্গে বসে ঘাড় গুঁজে মোবাইল ফোন ঘাঁটতে। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই, একে অন্যের খোঁজখবর জানা নেই, হাসির হুল্লোরে লুটিয়ে পড়া নেই। কলেজেও একই দৃশ্য। যে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে কয়েক বছর আগেও ছেলে মেয়েরা আড্ডায় মেতে উঠত, বয়ে যেত নির্দিষ্ট ক্লাসের সময় সেখানে আজ বিভিন্ন মোবাইল থেকে বিভিন্ন রিলসের আওয়াজ।

ফুড ভ্লগিং এখন ট্রেন্ড। কিচ্ছু জানার, বোঝার দরকার নেই, ক্যামেরা হাতে একটা বিরিয়ানির দোকানে দাঁড়ালেই হল, বিরিয়ানি কাটা আর তাতে কে কত কেজি ঘি ঢালছে দেখালেই শ’য়ে শ’য়ে ভিউস। একই দোকানের, একই ভিডিও অসংখ্য ভ্লগারের ক্যামেরায় বারবার, অসংখ্যবার। নতুন দোকান, নতুন নতুন খাবারের দোকান খোঁজার আগ্রহ নেই, পুরোনো খাওয়ারকে নতুনভাবে খুঁজে আনার, তুলে ধরার তাগিদ নেই, স্বাদ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, সারাদিন বিরিয়ানিতে ঘি ঢালার ভিডিও দেখিয়ে ব্যর্থ কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার চেস্টায় মাতোয়ারা যুবসমাজ।

এই তো সেদিনই স্ক্রল করতে করতে চোখে পড়ল এক ভ্লগার, যার ফলোয়ার্সের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ সে বলছে, বাহ! মাছে কাটাও আছে! অথচ এই ভিডিও বানিয়েই সে টাকা আয় করছে। একজনকে দেখা গেল ডেইলি ভ্লগের নামে নিজের শরীর দেখিয়ে, স্নানের ভিডিও দেখিয়ে দিব্য অর্থ উপার্জন করছে। জানি না, এদের এইসব কন্টেন্ট দেখে কোন প্রজন্ম কী শিখছে! অবশ্য এইসব ভ্লগারদের আমি তত দোষ দেখি না। আমরা গিলছিই এসব, ঘন্টার পর ঘন্টা কোনো কাজ না করে, নিজের বহুমূল্য সময় ও নেট ব্যয় করে এসব দেখে যাচ্ছি। ভিউস বাড়াচ্ছি, লাইক, কমেন্ট ও সেয়ার করছি। ওদের লাভ তো আমরাই করাচ্ছি, ওরা বানাবে না কেন! পারছি ওদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে?

এক আর্টিক্যলে পড়ছিলাম, একটি গবেষণায় জানা গিয়েছে মানুষের মস্তিস্ক এখন অনেক বেশি অস্থির হয়ে পড়ছে৷ কমছে মনোযোগ। এর অন্যতম কারণ হিসেবে জানা গিয়েছে, মানুষের এই প্রতিনিয়ত স্ক্রল করার স্বভাব। ফোন খুললেই রিলসের ছড়াছড়ি, একটার পর একটা। বুড়ো আঙুলের ঠেলায় নিচ থেকে মুহূর্তেই ওপরে উঠে আসছে নিত্য নতুন ভিডিও। এক থেকে দুই মিনিটের ভিডিও, অথচ তাও দেখার ধৈর্য্য নেই কারো, স্কিপ অপশনে হাত চলে যায় বারবার।

অস্থির এ এক সময়। নেই কারো প্রতি কারো ন্যুনতম সম্মান। বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা নেই, ছোটদের জন্য স্নেহ ভালোবাসাও কোথাও যেন উধাও। এই তো কিছু বছর আগেও ছাত্র ছাত্রীদের দেখেছি শিক্ষক শিক্ষিকাদের দেখে সাইকেল থেকে নেমে মাথা নিচু করে যেতে, আমরা নিজেরাও আজও শিক্ষকদের দেখে রাস্তা বদলে নিই, অথচ আজকের প্রজন্মের সেই শিক্ষা কোথায়! সাইকেলের বেল বাজিয়ে নির্দ্বিধায় তারা পেরিয়ে যায় শিক্ষকদের, মুখে অশ্লীল ভাষার লাগাম নেই।

এমন এক সময়ে মেয়েদের প্রতি আলাদা কোনো সম্মান থাকবে সেটা ভাবাও বোধহয় একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। নারী নির্যাতন কথাটা এই আধুনিক সময়ে যেখানে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে এটাই এখন ট্রেন্ড কিনা কে জানে! ঘরে ঘরে গোপনে নারীর অসম্মানের কথা ছেড়ে দিলেও ধর্ষনের মতো জঘন্যতম অপরাধও আজ আকছাড় হয়ে চলেছে।

পরিসংখ্যান বলে, আমাদের দেশে প্রতি ঘন্টায় ধর্ষিত হন চারজন নারী (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো), এর মধ্যে তিনজনের ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত পূর্বপরিচিত। প্রতিদিন গড়ে ৮৬টি ধর্ষণের মামলা করা হয় তার মধ্যে আবার ৫২টি কেসে নির্যাতিতা ১৮ থেকে ত্রিশ বছরের মধ্যে। ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন আসলে নিজের পৌরুষত্বের আস্ফালন, ‘তথাকথিত’ দূর্বলের ওপর নিজের শক্তি কিম্বা ক্ষমতার প্রদর্শন। তবে শুধুমাত্র শারীরিকভাবে নিপীড়নকেই যে আমরা ধর্ষণ বলব তা তো নয়, নারীরা নির্যাতিত, অপমানিত কিম্বা লাঞ্চিত হন অনেকভাবেই। প্রতিদিন চলা ফেরার পথে ইচ্ছে করে শরীরের সঙ্গে শরীরকে ছুঁইয়ে দেওয়া, ভিড় বাসে কিম্বা ট্রেনে গোপন কোনো অংশ স্পর্শ করা তো আছেই। তবে শুধুমাত্র মেয়েরাই বুঝতে পারে কোন দৃষ্টি দিয়ে কে কীভাবে তাকালে বাড়ি ফিরে সেই মেয়েটিকে স্নান করে পরিস্কার করে নিতে হয়। এগুলোও কি ধর্ষণের সমার্থক নয়!

আজ আমরা অতি আধুনিক, মননে, শরীরে আর চালচলনে। নারীরা আজ কোনো অংশে কম নয়, কোনোদিনও ছিলও না। কিন্তু শুধুমাত্র শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্যর কারণে প্রতি মুহূর্তে এই লাঞ্ছনার স্পর্শ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ভাবতে অদ্ভুত লাগে যে বয়সে কোনো শিশুকে রূপকথার গল্পে বিভোর রাখার কথা সেই বয়সেই আমরা, কিছু ‘সচেতন’ বাবা ও মা তাদের ‘গুড টাচ’, ‘ব্যাড টাচ’ শেখাই, জানাই কখন কে শরীরের কোন কোন স্থান স্পর্শ করলে চিৎকার করে উঠতে হয়।

সেই পুরাণের কাল থেকে নারীদের ওপর এমন অত্যাচার এই উত্তর আধুনিক যুগেও একইভাবে কায়েম আছে তা কোনোভাবেই কি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়? যে দেশে গার্গী, মৈত্রেয়ী, লোপামুদ্রার মতো নারীরা জন্মেছেন, যে দেশের মানুষ অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী এই পাঁচ সতীর নাম নিয়ে সকাল শুরু করেন, যে দেশে কালীকা শক্তি মাতৃকা শক্তিরূপে পূজিত, দুর্গা, লক্ষ্মী কিম্বা সরস্বতীর আরাধনায় ব্রতী আমরা সকলে সে দেশে কন্যারা, নারীরা এমনকি শিশুরাও সুরক্ষিত নয়। বিষয়টা কেমন পরস্পর বিরোধী হয়ে যায় না?

আসলে ‘মানুষের’ মন থেকে ভয় উবে গেছে আশ্চর্যজনকভাবে। যদিও অবশ্য সেইসব পিশাচদের আদৌ মানুষ বলা চলে কিনা সত্যিই জানা নেই। তাই এখনই সবটা নতুন করে সাজানো দরকার। দরকার ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের’।

ওই যে আমার চিৎকার করে বারবার বলি, ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’, সত্যিই এবার সেই দৃষ্টান্ত দেখানোর সময় এসেছে। জানি চোখের বদলে চোখ উপড়ে ফেলার পক্ষে অনেকেই সন্মতি দেবেন না, কিন্তু এই ক্ষেত্রে অন্তত অন্য কোনো রাস্তা চোখেও তো পড়ছে না আর। নাকি আছে? আর তার জন্য প্রয়োজন আরও অনেক আলোচনার, গবেষণার কিম্বা আরও কিছু এমন অনভিপ্রেত ঘটনার।

এর শেষ কোথায়? কবে আমরা বলতে পারব ‘সেদিনের’ ‘সেই’ ঘটনাটাই শেষ ধর্ষণ ছিল। কবে ঘটবে এমন একটা মিরাক্যল। প্রশ্ন অনেক। উত্তর খোঁজা চলছে। জানি না কবে সব প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক মিলবে।

এত কিছুর পরও আমরা আশাবাদী। এখনও বিশ্বাস রাখি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। দেশ জুড়ে, রাজ্য জুড়ে হয়ে চলা অরাজকতা খুব শিগগির শেষ হয়ে যাবে। যন্ত্রমুখগুলো খুব তাড়াতাড়ি আবার মানুষ হয়ে উঠবে।

অভয়ার ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে ঘুরে দাঁড়াতে, শিখিয়েছে আবার দল বাঁধতে। না, এই দল কোনো ধর্ম, কোনো রঙের দল নয়। এই দল রঙ, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে পথে নামার দল, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাত জাগার দল। আর এই দলই একমাত্র পারে সব বাধা কাটিয়ে নতুন ঝকঝকে একটা দিনের শুরু করতে, আমরা সেই দিনের দিকেই তাকিয়ে থাকি বরং।

মানুষের মন থেকে যেদিন ভয় উড়ে যায় সেদিন তার আর কোনো অন্যায় করতে বুক কাঁপে না। নইলে সারা রাজ্য যেসময় জ্বলে উঠেছে সেই সময়ই কেন পর পর এত একই রকম ঘটনা ঘটবে? কলকাতা থেকে এন জে পি কত নাম উঠে আসছে এই ক’দিনে।

মানুষ এখন সস্তা জনপ্রিয়তার লোভে উদ্দাম নৃত্য করতে ব্যস্ত। তার বাইরে ভাবার মতো বোধ বুদ্ধি সবকিছু কমতে কমতে ক্রমশ তলানিতে ঠেকেছে। দল টল সব মিথ্যে। এখনই অন্য কেউ ক্ষমতায় আসুক দেখবেন পালটি খাওয়া কাকে বলে!

প্রত্যন্ত গ্রামে কর্মসূত্রে রোজ যেতে হয় দেখি তাদের খুব কাছ থেকে। কীভাবে একটা প্রজন্ম জাস্ট মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে শেষ হয়ে যাচ্ছে৷ শহরেও একই দৃশ্য। এসব দেখে আপনি প্রতিবাদও করতে পারবেন না। না, আপনার সে সময়টুকু নেই। যদিও থাকে তবে আপনার শিরদাঁড়াটা সোজা নেই। তাও যদি থাকে তবে উল্টোদিকের মানুষটা আপনাকে পাত্তাই দেবে না। কার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবেন? কিছু লাভই নেই।

কাউকে ভালো বুদ্ধি দিতে গেলে শুনবেন এই লোকটা খুব জ্ঞান দেয়। না এই জ্ঞান তাদের গ্রহণ করার প্রশ্নই ওঠে না, বরং ওই জ্ঞানের মতো তারা আপনাকে ছুঁড়ে দেবে আস্তাকুঁড়ে।

এই যে মিছিল, প্রতিবাদ প্রতিবাদ খেলা, ধিক্কার ধ্বনি সবটাই ভেতরের ব্যাপার। যতক্ষণ না পর্যন্ত মানুষের মনে তা গেঁথে যাচ্ছে কোনো কিছুই ঠিক হওয়া সম্ভব নয়। এই অপরাধীরা হয়ত ধরা পড়বে খুব শিগগির, অপরাধ মুছে যাবে না।

আমাদের প্রত্যেকের মনে এক একজন শয়তানের বাস। আমরা কেউ তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখি, কেউ পারি না। আর পারি না বলেই এত এত অপরাধ, এত অন্যায়। ভয় নেই, লজ্জা নেই। কিচ্ছু না।

মনটা আগে শুদ্ধ করা দরকার। বাকিসব এমনিই হয়ে যাবে।

'এ এক ভয়ঙ্কর সময়' - শাঁওলি দে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top