‘জয়ী সেতু’ হলদিবাড়ি-মেখলিগঞ্জ তথা কোচবিহারের ব্যবধান ঘুচে যাওয়া, এ এক কালজয়ী পদক্ষেপ
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে ‘জয়ী সেতু’ সম্পর্কে লেখিকা শাঁওলি দে-র কলম –
‘জয়ী সেতু’ হলদিবাড়ি-মেখলিগঞ্জ তথা কোচবিহারের ব্যবধান ঘুচে যাওয়া, এ এক কালজয়ী পদক্ষেপ :
তিস্তা উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান নদী। শুধুমাত্র এই নদীকে কেন্দ্র করেই এবং এই নদীর খাত, গতি পরিবর্তন প্রভৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে কিছু জনপদ। দক্ষিণে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা এমনই এক জনপদ হল হলদিবাড়ি, যা প্রান্তিক শহর হিসেবেও বর্তমানে পরিচিত। বহু প্রাচীন এই জনপদটি ঐতিহ্যমন্ডিত, রাজার শহর না হয়েও যার মেজাজ অনেকাংশেই রাজকীয়।
হলদিবাড়ি কত প্রাচীন সে নিয়ে বিতর্ক আছে , তবে ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে এর কোনো অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় না। কালের অতলে হারিয়ে গিয়েছে হলদিবাড়ির জন্মের সময়কাল। তবু ১৮৭৬ সালটিতে হলদিবাড়ি অঞ্চলটি শহরের মর্যাদা পেয়েছিল বলে বিভিন্ন নথিতে পাওয়া যায়। ‘হলুদ ’ বা ‘হলদি’ জাতীয় গাছের থেকে যে জায়গার নামের উৎপত্তি, সেখানে বর্তমানে তার প্রাচুর্য না থাকলেও আজও প্রাচীন মানুষের মুখে মুখে ফেরে কত কথা ! শোনা যায় এখানকার হলুদের বীজ নিয়ে যেতেন দূর দুরান্তের কৃষকেরা, ফলনের পর তাদের মুখে লেগে থাকত চওড়া হাসি।
একসময় ছবির মতো সাজানো ছিল এই অঞ্চল, যা কালে কালে লোকবসতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটাই পালটে গেছে ঠিকই, কিন্তু এই অঞ্চলের শান্ত, কোমল স্বভাবকে কমাতে পারেনি একফোঁটাও। এখনো যেন এখানকার জন মানবের গায়ে লেগে আছে মাটির কাঁচা গন্ধ। শহুরে রোদ্দুর হয়ত এখনো পর্যন্ত এর রঙকেফিকে করে উঠতে পারেনি।
ছোট্ট শহর হলদিবাড়ি। জেলা কোচবিহার হলেও মূল সদর থেকে এর দূরত্ব অনেক বেশি , প্রায়১৩৫ কিমি। জনসংখ্যা ২০১১ এর আদম সুমারি অনুসারে প্রায় ১৭,০০০ এর কাছাকাছি। তবে বর্তমানে ভারত বাংলাদেশ ছিট্মহল বন্টনের ফলে জন্যসংখ্যা এক ধাক্কায় বেড়ে গেছে অনেকটাই। বাংলাদেশ থেকে আসা এই ছিট্মহলবাসীদের জন্য গড়ে তোলা হচ্ছে ‘এনক্লেভ সেটলমেন্ট ক্যাম্প।‘ আপাতত অস্থায়ী শিবিরে থাকলেও খুব শীঘ্রই এদের নিয়ে যাওয়া হবে অদূরের স্থায়ী পাকা বাসস্থানে। ঘর পাবে ছাদহীন মানুষ , পরিচয়হীন মানুষগুলো পাবে সারাজীবনের জন্য না,ভোট দেওয়ার অধিকার।
২০১৬ সালে ৩১শে জুলাই আর ১লা আগষ্টের সন্ধিক্ষণে ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি অনুসারে ছিটমহল বিনিময় হয়। ১১১টি ভারতীয় গ্রামের মানুষকে পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশ আর ৫১টি বাংলাদেশের ছিট এসেছিল ভারতে। তার মধ্যে এই হলদিবাড়ি অন্যতম। ছিয়ানব্বইটি পরিবার ,মোট দশটি ছিট থেকে এই হলদিবাড়িতে এসেছে এক বুক আশা নিয়ে। এই জল হাওয়ার সঙ্গে একাত্ম হতে ,এখন সেই আত্মীয়তা তৈরি হয় কিনা এটাই দেখার।
হলদিবাড়িতে বেড়াতে আসলে প্রথমেই বলতে হয় বর্ডারের কথা। চারদিক ঘিরে রয়েছে বাংলাদেশ বর্ডার। আছে কিছু সুসজ্জিত বিএসএফ ক্যাম্প। এটি মূলত পৌর এলাকা, কিন্ত চারপাশে ছড়িয়ে আছে সবুজ মাঠ ভর্তি ফসলের গ্রাম এবং তিস্তা নদী।মূল শহরে রয়েছে দুটি বড় উচ্চ বিদ্যালয়, একটি পার্ক, শতাব্দী প্রাচীন একটি লাইব্রেরি, হাসপাতাল, পোষ্ট অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ আর বিরাট অঞ্চল নিয়ে তৈরি হুজুর সাহেবের মাঠ। মাঠেই রয়েছে বিরাট মাজার শরিফ “দরবারে একরাম।‘’উলটো দিকে খোকা হুজুরের নব নির্মিত সমাধিস্থল। এছাড়াও আরও কিছু সমাধি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এই মসজিদের গায়ে লেপ্টে থাকা সুবিশাল মাঠেই বসে পবিত্রমেলা। সংলগ্ন পাড়াটিও মেলার মাঠ নামে পরিচিত।
হয়ত তেমন কিছুই নেই এই হলুদ শহরে, তবে যা আছে ,যেটুকু আছে সবটাই সযত্নে সঞ্চয় করে রাখার মতোই দামি, ‘প্রেশাস’। কলকাতাসহ সারা বাংলার কাছেই হলদিবাড়ি নামটি খুবই পরিচিত, এর কারণ আর কিছুই নয় উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতাগামী মুখ্য ট্রেনগুলিরই রোজকার যাত্রা শুরু এই প্রাচীন রেলপথ দিয়ে,দার্জিলিঙ মেইল,তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস এবং কলকাতা চিৎপুর ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস। এই রেল পথ নিয়েও এখানকার মানুষের গর্বের শেষ নেই আর থাকবে না-ই বা কেন ? একসময় এই পথেই কলকাতা থেকে দার্জিলিঙ গিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ,এসেছিলেন সস্ত্রীক দেশপ্রিয় যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। আজও স্টেশনের পুরোনো বটগাছটার আনাচে কানাচে এমন কত কথা কান পাতলেই শুনতে পাওয়াযায়।
প্রসঙ্গত হলদিবাড়িতে রেল যোগাযোগ শুরু হয়েছিল ১৮৭৬ সালে। আজ তা কলেবরে বাড়লেও, আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পুরোনো ঐতিহ্যকে মুছে ফেলতে পারেনি একফোঁটাও। অতি সম্প্রতি এই রেলপথের ইতিহাসে আরও একটি পালক জুড়তে চলেছে , শুরু হচ্ছে হলদিবাড়ি থেকে বাংলাদেশ রেল পরিসেবা,সীমানা পেরিয়ে আরেকটি দেশকে ছুঁয়ে ফেলবে আমাদের এই রেলপথ সেই অতীতের মতো। গর্ব হবে না ? কাজ চলছে জোরকদমে, এখন শুধুই সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তের অপেক্ষা।
হলুদবাড়ির উত্তরে জলপাইগুড়ি জেলার কচুয়া-বোয়ালমারি (নন্দন পুর) ও খারিজা বেরুবাড়ি এক নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত। পশ্চিমে জলপাইগুড়ি জেলার খারিজা বেরুবাড়ি দুই নম্বর এবং দক্ষিণ বেরুবাড়ি (মানিকগঞ্জ) গ্রাম পঞ্চায়েত। বাকি অংশে বাংলাদেশ সীমান্ত। দক্ষিণের সম্পূর্ণ অংশটাইই বাংলাদেশ।
রেললাইন স্থাপনের আগে হলদিবাড়ির সঙ্গে অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম বলতে ছিল একমাত্র তিস্তা নদী। তাই তিস্তার গা- লাগোয়া দেওয়ানগঞ্জ নামের গ্রামটি ছোট হলেও ব্যবসা বানিজ্যের দিক থেকে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে কালের প্রবাহে তিস্তা নদীর মুখ ঘুরে যাওয়ায় তিস্তার অপর পাড়ের মেখলিগঞ্জ নামক জায়গাটি রাজ্যের সমৃদ্ধ বন্দর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে, যদিও এই বন্দরের প্রধান রপ্তানী দ্রব্য ছিল তামাক পাতা। তামাক কেনার জন্য ব্রহ্মদেশ থেকে বণিকরা মেখলিগঞ্জে আসতেন,কেউ কেউ আবার কোচবিহার ও জলপাইগুড়িতে বসবাসও শুরু করেন।
এরপর যখন ১৯৭৬ সালে রেললাইন স্থাপিত হয় তখন থেকেই বলা যায় এই অঞ্চলের জীবনযাত্রা একটু একটু করে পাল্টাতে থাকে। জুট কোম্পানিগুলো ব্যবসা শুরু করায় বাইরে থেকে প্রচুর লোক আসতে লাগলেন এখানে।
যদিও যাতায়াত তখনও ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিস্তা নদী নির্ভর। হলদিবাড়িতে নেমে রাজপুরুষদের ইমিগ্রেশন রোড ধরে কোচবিহার শহরে পৌঁছাতে গেল সেই তিস্তা নদীই পেরোতে হত।
দেশভাগের পর রেল ব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন যেমন এল, তেমন সড়ক পথে যাওয়া আসার জন্য বাসের ব্যবস্থাও হল। ১৯৪৯-৫০ সাল নাগাদ সেভক-মালবাজার-চালসা হয়ে কোচবিহার যেতে হলে শিলিগুড়ি থেকেই বাসভাড়া ছিল সাত টাকা বারো আনা, জলপাইগুড়ি থেকে কোচবিহার যেতে হলে বার্নিসঘাট পেরিয়ে যেতে হত, ভাড়া ছিল চার টাকা।
এরপর ধীরে ধীরে রেল, সড়ক ব্যবস্থার ব্যপক উন্নতি হয়। কাঁচা রাস্তাগুলো পাকা হয়, রেলের সংখ্যা বাড়ে, মেটে বাসের সমস্যাও। ইদানিংকালে সকাল থেকে রাত অহরহ বাস চলাচল করে হলদিবাড়িতে। রয়েছে অটো, ম্যাজিকের মতো যানও। যানবাহনের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গার মধ্যে দূরত্ব ঘটেছে নিঃসন্দেহে।
হলদিবাড়ি শহরের দুদিকে একেবারে গা-লাগোয়া জেলা শহর জলপাইগুড়ি, অন্যদিকে তিস্তা ও আরেকদিকে বাংলাদেশ। কিন্তু হলদিবাড়ি কোচবিহার জেলার আওতায় থাকা একটি অঞ্চল। যেখানে হলদিবাড়ি থেকে জেলা জলপাইগুড়ির দূরত্ব মাত্র ছাব্বিশ কিলোমিটার, সেখানে নিজের জেলা কোচবিহারের দূরত্ব এক’শ পয়ত্রিশ কিলোমিটার। আবার অদ্ভুতভাবে মহকুমা শহর মেখলিগঞ্জ কোচবিহার থেকে কাছে হলেও হলদিবাড়ি থেকে এর দূরত্ব চুয়াত্তর কিলোমিটার।
হলদিবাড়িবাসীকে বিভিন্নকাজে সবসময়ই ছুটতে হয় জেলায় ও মহকুমায়। আয়কর ও বিক্রয় করেরদপ্তর বাদ দিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সবকটি অফিসই কোচবিহার ও মেখলিগঞ্জে অবস্থিত। অথচ এই জেলা ও মহকুমার ও হলদিবাড়ির মধ্যে সরাসরি চলে এমন কোনো সরকারি বাস নেই। নেই রেলপথও। বর্তমানে কোচবিহার পর্যন্ত দুটো বেসরকারি বাস চললেও সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন চার ঘন্টা। একটামাত্র সইয়ের জন্য ভোর থাকতে বাসে উঠে অর্ধেকদিনই বাসে কাটিয়ে কাজ সেরে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যায়। টাকা ও শরীর অপচয় হয় দুইয়েরই। মেখলিগঞ্জের বাস ছাড়ে দুপুরে। তাই অফিসের কাজে যেতে হলে বাস পালটিয়ে জলপাইগুড়ির ওপর দিয়ে যেতে হয়, নয়ত ভরসা আজও সেই সাবেকি তিস্তা।
বালির চরের ওপর সাইকেল বা বাইক চালিয়ে কিম্বা বর্ষার সময় জলের ওপর বেতের ব্রিজ পেরিয়ে তবেই পৌঁছাতে হয় ওপারের মেখলিগঞ্জে। কখনো কখনো বাহন হিসেবে মেলে নৌকাও। তবে ভরা বর্ষায় তিস্তা ভয়ঙ্করীরূপ ধারন করলে দুর্ঘটনা হতেও বেশিক্ষণ লাগে না। হলদিবাড়ি ও তার আশপাশে রয়েছে অনেকগুলো প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র, জুনিয়র হাইস্কুল ও সরকারি অফিস।সেখানে বেতন থেকে শুরু করে পেনশন হওয়া পর্যন্ত কাজ কিছু কম নয়। রয়েছে হালফিলের কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রীর মতো বেশ কিছু প্রকল্পও। এইসব যাবতীয় কাজের খুঁটিনাটির জন্য এখানকার মানুষদের নির্ভর করে থাকতে হয় মেখলিগঞ্জের ওপর। বিশেষ করে অবসর গ্রহণের পর একজন বয়স্ক শিক্ষক বা অন্যান্য অফিস কর্মীর পক্ষে এই কষ্টসাধ্য রাস্তায় পারাপার করা কার্যত অসম্ভব। মামলা মোকদ্দমার জন্যও হলদিবাড়িবাসী মেখলিগঞ্জের মুখাপেক্ষী। এইসব কারণেই হয়ত মানুষের মনে ধীরে ধীরে ক্ষোভ বেড়ে চলছিল যা আরও ইন্ধন পায় জলপাইগুড়ি জেলা থেকে বের করে আলিপুর দুয়ারকে আলাদাজেলা হিসেবে চিহ্নিত করার পর থেকে।
এইসময়ই গড়ে ওঠে হলদিবাড়ি নাগরিক মঞ্চ। হলদিবাড়ির কিছু মানুষের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে অসুবিধার বিষয়টা আরও খানিকটা পরিষ্কার হয়।
(১) কোচবিহার জেলার সবকটি কলেজকে ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনা হয়েছে। বলাই বাহুল্য সেখানে রয়েছে হলদিবাড়ির নেতাজী সুভাষ মহাবিদ্যালয়ও। কিন্তু যাতায়াতের অসুবিধার কারণে এই আনন্দের বিষয়টা ছাত্র-ছাত্রীর কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠছে।
(২) শিক্ষা বিষয়ক কর্মশালাগুলো সব কোচবিহারে হয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের হয় সেখানে রাত্রিযাপন করতে হয় নতুবা কাক ভোরে বেরিয়ে রাতে ফেরা ছাড়া আর উপায় থাকে না। স্বভাবতই কর্মশালা চলাকালীন বাস ধরার তাড়া থেকেই যায়। কোনো কাজই ঠিকমতো হয় না।
(৩) মামলার জন্য দুপক্ষের লোকজন ও স্বয়ং উকিলদেরও এই কষ্টকর রাস্তায় রোজ যাতায়াত করার পরও সময়মতো কোর্টে হাজির হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া কখনো কখনো কোচবিহার আদালতেও ছুটতে হয়।
(৪) সরকারিভাবে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মসূচী ও প্রকল্পের থেকে বঞ্চিত হলদিবাড়ি। যা কিছু সব তিস্তার ওপারে। এপারের জন্য বরাদ্দ খুব সামান্য বা কখনো কিছু না।
(৫) ট্রেজারির কাজ, এস.আই., এ.আই. ও ডি.আই অফিসে বিভিন্ন বিল ও কাগজপত্র জমা, লাইসেন্স নবীকরণ, পারমিট সংগ্রহ সব কাজই করতে যেতে হয় কখনো মেখলিগঞ্জে কখনো বা কোচবিহারে। যা কষ্টসাধ্য তো বটেই, ব্যয়সাধ্য এবং সময়সাপেক্ষও।
(৬) হলদিবাড়ি থেকে বেলতলি যাওয়ার পথে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় তিস্তা চর ও তার আশপাশের অঞ্চলে সন্ধের পর যেতে নানাবিধ অসামাজিক কাজের সন্ধান পাওয়া যায়।
শুধুমাত্র ভৌগলিক কারণে এত অসুবিধা অথচ তা দূরিকরণে এতদিন ধরে কেন বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ তার কারণ হলদিবাড়িবাসীর কাছে আজও অজানা। হাজারও আন্দোলন, দাবি, নাগরিক মঞ্চ গঠন, আরও বৃহত্তরআন্দোলনকর্মসূচি সব কিছু ছাপিয়েও কোনো সুরাহা হয়নি, ফলে কালক্রমে এইসব বিক্ষিপ্ত ক্ষোভ বিক্ষোভের আকার ধারণ করে। ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে ২০১৫সালের ৬আগস্ট বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দোপাধ্যায় আসেন হলদিবাড়ি সফরে। হলদিবাড়ির পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে তিনি আরও বেশ কিছু প্রকল্পের সঙ্গে হলদিবাড়ি মেখলিগঞ্জের সংযোগ রক্ষার সুবিধার্থে একটি সেতু নির্মানের পরিকল্পনা নেন। নাম দেন ‘জয়ী সেতু।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষনার সঙ্গে সঙ্গে হলদিবাড়িবাসীর এতদিনের বঞ্চনা, যন্ত্রণার অসবানের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। জয়ী সেতু নির্মাণের ঘোষনার সঙ্গে সঙ্গে হলদিবাড়িবাসী আনন্দে মেতে ওঠে। অন্যদিকে কিছু মানুষ এই ঘোষনায় ভোটের চমকের গন্ধও পান। স্থানীয় এক মানুষের কথায়, ‘’না আঁচালে বিশ্বাস নেই। যতদিন না পর্যন্ত সেতু নির্মানের কাজ শুরু হচ্ছে কিছুই বলা যায় না।‘’
তবে স্থানীয় মানুষের এই আশঙ্কাকে মিথ্যে করে জোরকদমে শুরু হল জয়ী সেতুর কাজ। হলদিবাড়ির বেলতলি ঘাট থেকে মেখলিগঞ্জ অবধি দুই ভাগে তিস্তা নদীর ওপর এই সেতু তৈরি হবে তেমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তিস্তার এইপারে হলদিবাড়ির বক্সীগঞ্জ, পার-মেখলিগঞ্জ ও ওপারে মেখলিগঞ্জ এক সংস্কৃতি হলেও এতদিন ছিল আলাদা। এখন এই তিনের সেতুবন্ধনের খবরে স্বভাবতই খুশি হল সকলে।
হলদিবাড়ি শহর থেকে বেলতলি ঘাটের দূরত্ব দশ কিলোমিটার, আবার বেলতলি থেকে মেখলিগঞ্জের দূরত্ব মাত্র ছয় কিলোমিটার হলেও ঘুরপথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে আশি কিলোমিটার। সেতু তৈরি হলে এই দূরত্ব ঘুচবে। মাত্র ষোলো কিলোমিটার রাস্তা পেরোলেই যেখানে মেখলিগঞ্জ পৌঁছানোর কথা, সেখানে বাস ও অন্যান্য সমস্যার কারণে অনেক বেশি রাস্তা পেরোতে হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর জয়ী সেতুর ঘোষনায় তাই খুশির আবহাওয়াই বেশি দেখা গিয়েছিল হলদিবাড়ি তথা মেখলিগঞ্জ, চ্যাণড়াবান্ধা ও কোচবিহারবাসীর কাছে। চার’শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিয়মান এই সেতুর কাজ অবশেষে শেষ হয়েছে এবং গত সেতুটি 1 ফেব্রুয়ারী 2021 সালে খোলা হয়েছিল।
কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকার পর আবার সেতুর কাজ পুরোদমে চলেছে। পিলার তৈরি হয়েছে অনেকগুলোই। হলদিবাড়ি শহর থেকে দেওয়ানগঞ্জ রোড ধরে সোজা চলে গেলে সেসময় দেখা মিলত হাজারও শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়রদের কর্মকান্ড। চলত বড় বড় ট্রাক, সরকারিগাড়ির অহরহ আনাগোনা। বিকেলবেলায় সেতু তৈরির কাজ দলে দলে দেখতে যেত নারী পুরুষ শিশু নির্বিশেষে। তার ওপর ছিল পি.ডব্লুই.ডি.র আওতায় নির্মিয়মান দেওয়ানগঞ্জ রোডের কাজ, সব মিলিয়ে জমজমাট কান্ড।
জয়ী সেতুর তৈরি স্বপ্ন সফল হয়েছে বলে হলদিবাড়ির চাকরিজীবি, নিত্যযাত্রী, উকিল, ব্যবসায়ীরা যেমন উপকৃত হয়েছে, তেমনি মেখলিগঞ্জ বা কোচবিহারবাসীদেরও যে অনেক সমস্যা মিটেছে সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই স্বপ্নের মাঝেও কিছু ভয়ের কথা শোনা যায় স্থানীয় মানুষদের মুখে।
এই সেতু তৈরি হওয়ায় দূরত্ব যেমন ঘুচেছে, তেমন অনুপ্রবেশকারীরাও আকছার ঢুকে পড়ছে কিনা হলদিবাড়ি ও মেখলিগঞ্জে, কে বলতে পারে? যথাযথ প্রশাসনিক বেড়াজাল না থাকলে দুষ্কৃতিদের প্রবেশের আশঙ্কাও থেকেই যায়। উপরন্তু যেখানে হলদিবাড়ির সীমানা ঘেঁষে বাংলাদেশ রয়েছে। এই সেতু কি চোরাকারবারিদের পথ আরো খানিকটা সুগম করে দেবে ? এর উত্তর ভবিষ্যত দেবে।
এই আলোর মধ্যেই অন্ধকার লুকিয়েই থাকে। এত সুন্দর সেতুর আর তিস্তা নদীর সৌন্দর্য চাক্ষুস করার জন্য আজও অসংখ্য মানুষ জয়ী সেতুতে এসে দাঁড়ায়। প্রচুর যানবাহন চলাচল করার ফলে দুর্ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি, সেলফি তোলায় ব্যস্ত ছেলেদের আহত হওয়ার খবর কানে আসে, স্বভাববশত মানুষ নোংরা করে জয়ী সেতুর সৌন্দর্য। স্পিড লিমিট না মানার কারণে দুইচাকা, চারচাকার গাড়ি বেসামাল হয় মাঝেমধ্যেই।
তিস্তার এই পারে দেওয়ানগঞ্জ, পারমেখলিগঞ্জসহ অনেকগুলো ছোট ছোট গ্রাম রয়েছে। কৃষিকাজই যাদের প্রধান জীবিকা। ইদানিং কেউ কেউ টোটো রিক্সাও চালায়। একমাত্র দেওয়ানগঞ্জটি তুলনামূলক উন্নত হলেও অন্যান্য গ্রামগুলো চরিত্রগত দিক থেকে এখনও অনুন্নতই রয়ে গিয়েছে। তিস্তায় সেতু হওয়ায় এই প্রায়ান্ধকার সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামগুলোতে উন্নতির আলো, প্রগতির আলোর ছটা এসে পড়েছে অবশ্যই। গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান পাট, যাতায়াতের সুবিধা হয়েছে বলে ব্যবসা বানিজ্যও বেড়েছে, আমদানী, রপ্তানীর প্রসার ঘটেছে।বাস চলছে, চলছে ছোট ছোট গাড়ি। কম দূরত্বের জায়গায় টোটো বা রিক্সাও প্রচুর। দূরত্বের কারণে যারা কোচবিহারের কলেজগুলোতে যেতে পারত না, তারা পৌঁছে যাচ্ছে সেখানে সহজেই। শিক্ষার প্রসারও বাড়ছে। মানুষের কাছে আরও অনেক কাজের পথ খুলে গেছে। আর একথা কে না জানে, কাজ বাড়লে, শিক্ষার আলো এসে পড়লে সেই জায়গা আর অন্ধকার থাকে না।
‘জয়ী সেতু’র কাজ শেষ হওয়া একটা কালজয়ী পদক্ষেপ। এখন বাসে করে সুদৃশ্য সেতু পেরোতে পেরোতে এক বৃদ্ধ তার পাঁচ বছর বয়সীনাতিকে গল্প করে, ‘জানিস তো আগে এই রাস্তাটা আমরা নৌকায় পেরোতাম।’ ছোট্ট শিশুটির চোখ অবাক বিষ্ময়ে জ্বলজ্বল করে ওঠে। আর ঐ বৃদ্ধ মানুষটি সাক্ষী হয়ে থাকে এক ইতিহাস গড়ার, এক স্বপ্ন পূরণের। জয়ী সেতু হলদিবাড়িবাসীর চোখে স্বপ্ন পূরণই বটে।







