tari-songe-mone-pore-chelebelar-gaan-shaunli-dey

‘তারই সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান’ – শাঁওলি দে

EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে ‘তারই সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান’ – শাঁওলি দে রচিত মুক্ত গদ্য রচনাটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো – 

‘তারই সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান’ – শাঁওলি দে : 

সকাল থেকেই টিপটিপ টুপটাপ। রবিন ব্লু রঙের আকাশের বুকে যেন মুঠো মুঠো ছাই লেপে দিয়ে গেছে কেউ। কে একজন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, ‘শ্রাবনের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে’। কাচের জানালাটা অল্প খুলে দিতেই হুড়মুড়িয়ে কী যেন এসে মুহূর্তে চোখ মুখ ভিজিয়ে দিয়ে চলে গেল। কী ওগুলো ? গুঁড়ো গুঁড়ো মেঘ না মন খারাপ ?

মন খারাপই হবে হয়ত। নইলে সেইসব অযুত নিযুত ফেলে আসা স্মৃতির কথাই বা মনে পড়বে কেন ? জানালার শিক ধরে দাঁড়ালাম। চোখ বুজে উপভোগ করছি যা কিছু তার একটা অদ্ভুত রিমঝিম ছন্দ আছে, রুমঝুম সুর আছে। সেই সুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গেয়ে উঠলাম ‘বরষে গা শাওন, ঝুম ঝুমকে…আওগে যব তুম সজনা’ অথবা ‘মিয়া কি মল্লার’!

আজকাল বৃষ্টি নামলে দেখতে পাই একটা জল থইথই উঠোন, জলে ডুবে যাওয়া সিঁড়ি আর কচু পাতার ওপর একটা দুটো মুক্তোর দানা। সারাদিন অঝোরে বৃষ্টির শব্দ হত টিনের চালে, ঝমঝম ঝমঝম। দু’হাতে কান চেপে ধরতাম, মুহূর্তখানেক, ব্যস ! আবার শব্দ, আবার চুপ, তারপর আবার, আবার, আবার…

বারান্দা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বইপত্রের মাঝখানে বসে খাতার পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে কাগজের নৌকা বানাতাম সারাদিন, লিখে দিতাম নিজের নাম, ইচ্ছের কথা। নাম দিয়েছিলাম ‘ইছামতি’, তারপর সেটাকে ভাসিয়ে দিতাম উঠোনের জলে। আশপাশের দীঘি থেকে কিছু ছোট মাছ সাঁতরে বেড়াত উঠোন জুড়ে। নৌকা ভাসানোর সময় হাত দিয়ে জল ঠেলে ঠেলে এগিয়ে দিতাম সামনের দিকে। দু’একটা মাছ এসে আঙুল ঠুকরে যেত, আর আমি উত্তেজনায় কেঁপে উঠতাম তিরতির করে।

রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা খিচুড়ি আর ডিমভাজার গন্ধ পেলে আজও একটা ঝরঝর মুখর বাদল দিনের কথাই মনে পড়ে। সেসব রাতে মা লিখতে দিত হাজার শব্দের ‘একটি বর্ষণ মুখর সন্ধ্যা’ রচনা। লিখতে লিখতে আনমনা হয়ে খোলা জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ধরতাম বিন্দু বিন্দু জল, হঠাৎ ভেসে আসা দমকা বাতাসে হ্যারিকেনের আলো নিভে গেলে কান পেতে শুনতাম কারা যেন গাইছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ, ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ।

বৃষ্টিদিনে রাস্তায় বের হলে মাথার ওপরের ছাতাটা নিজের অজান্তেই সরে সরে যেত, যেন খানিকটা ইচ্ছে করেই ভুলে যেতাম মায়ের যাবতীয় সাবধানবানী। ছপছপ করে হাঁটতে হাঁটতে জোড়া পায়ে লাফিয়ে নিজেকে ও সঙ্গীকে আরও খানিকটা ভিজিয়ে দিতে কী যে ভালো লাগত !

এখন বর্ষা এলে এসব ভাবি। এক পা এক পা করে পিছোই পেছনের দিকে। ইদানিং বর্ষা আমায় যতটা ‘নস্টালজিক’ করে তোলে তত বেশি আমি আঁকড়ে ধরি রবি ঠাকুরকে। জানালার ধারে বসে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে গীতবিতানের পৃষ্ঠা উল্টাই, সঞ্চয়িতা থেকে কবিতা আওড়াই। দূরে ওই আমাদের সম্পূর্ণ অজানা চেনা আকাশ থেকে তখন এক অপরূপ মায়াবী আলো ভেসে আসে। সেই আলোয় ভিজতে ভিজতে বহু যুগের ওপার থেকে শুনতে পাই, ‘বাদল হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলেবেলার গান-/ বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর নদে এল বান / বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর নদে এল বান।।’

বৃষ্টির কিছু এলোমেলো ছাট, #মল্লারে প্রকাশিত

‘তারই সঙ্গে মনে পড়ে ছেলেবেলার গান’ - শাঁওলি দে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top