সূর্যাস্তের পর – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে সূর্যাস্তের পর – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো –
সূর্যাস্তের পর – শাঁওলি দে :
(এক)
বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দেওয়ালে হেলান দিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে অভীক অনেকক্ষণ। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সন্ধে থেকে লোডশেডিং। রাস্তার বাতিগুলোও জ্বলছে না তাই। বাড়িতে ইনভার্টার আছে, অথচ আজ কেউই কোনো ঘরে বাতি জ্বালায়নি। রাত অনেক হয়েছে তাই আশেপাশের সবাইও আলো নিভিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। শুধু এ বাড়িতে কারো চোখে ঘুম নেই।
এক ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই অভীক ওর পিঠে একটা স্পর্শ অনুভব করল। মাম এসে দাঁড়িয়েছে কাছে। শুকনো মুখে হাসির চেষ্টা করল অভীক। মাম অন্ধকারে টের পেল না কিছুই। ফিসফিস করে বলে উঠল, শোবে না? অনেক রাত তো হল!
-মা শুয়ে পড়েছে? শান্ত গলায় জানতে চাইল অভীক।
-হ্যাঁ। আমি এইমাত্র ও ঘর থেকে এলাম। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। একটা ঘুমের ওষুধ দিয়েছি। কেমন কৈফিয়ৎ দেওয়ার গলায় বলে উঠল মাম।
-উফ্ ! আবার ঘুমের ওষুধ দিতে গেলে কেন? ডাক্তারকাকু না করেছেন তো? অধৈর্য হল অভীক।
-সে তো জানি। কিন্তু আজ যা ছটফট করছিলেন ওষুধ না দিয়ে উপায় ছিল না। সারারাত কে পাহারা দিত? মাম বেশ জোরের সঙ্গেই কথাগুলো বলল।
-আমি দিতাম! অভীক বলল।
-হ্যাঁ। সে তো দেখতেই পাচ্ছি। সেই সন্ধে থেকে এভাবে দাঁড়িয়ে আছ। না কারো সঙ্গে কথা বলছ, না কিছু খেলে! তোমার দেখাদেখি যে বাড়ির কেউ খেল না সে খেয়াল আছে? এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল মাম।
-দেখাদেখি মানে? তুমি কি বলতে চাইছ কারো দুঃখ হয়নি? একমাত্র আমিই …
আর কিছু বলতে পারে না,গলা বুজে আসে অভীকের।
মামের খারাপ লাগে। এমন করে বলা উচিত হয়নি ওর। এমনিতেই সেই বিকেল থেকে কম ঝড় গেল না ওর মনের ওপর দিয়ে। একটু কাছে এসে গা ঘেষে দাঁড়ায় ও অভীকের।
প্রসঙ্গ পালটে বলে, যাও চোখে মুখে জল দিয়ে শুয়ে পড়ো এবার। কাল সকাল হোক। দেখবে নতুন ভোর হবে, সব পালটে যাবে।
-নাহ্! কিছুই পাল্টাবে না, আমি জানি। চিনি ওঁকে ভালো করে। একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে আর তার থেকে তাঁকে টলানো যাবে না। দেখে নিও তুমি! মামের ঘাড়ে হাত রেখে বলে অভীক।
হঠাৎ করেই আর কোনো কথা খুঁজে পায় না মাম। অভীক যা বলল, মাম জানে তা কতটা সত্যি! সেও তো কম দিন হল না এ বাড়িতে এসেছে! একটু হলেও তো এ বাড়ির মানুষগুলোকে চিনেছে ও।
অন্ধকার আরও গাঢ় হতে লাগল। অভীক ও মামের শোওয়ার ঘরেও এখন ঘন অন্ধকার। শুধু দুজনের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে ঘরময় নাচতে লাগল।
(দুই)
সকালে খাওয়ার টেবিলে কারো মুখেই কোনো কথা নেই। মাম ইচ্ছে না থাকলেও লুচিল,আলুর তরকারি বানিয়েছে। গরম গরম ফুলকো লুচি আর ডুমো ডুমো করে আলু কেটে কাঁচা লঙ্কা, তেজপাতা,কালো জিরে দিয়ে সাদা তরকারি,অভীকদের প্রিয় জলখাবার। অন্যদিন লুচি করতে করতে হাত ব্যথা হয়ে যায় মামের। আজ একটাই আস্তে আস্তে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে অভীক। খাওয়ার চাইতেও বলা ভালো দাঁতে কাটছে কেবল। উলটো দিকের চেয়ারে অভীকের বোন অভিলাষা মাথা নিচু করে বসে আছে। মাম জানে ওর চোখেও জল। অস্থির লাগল ওর। সত্যি এক মুহূর্তে মামের সাজানো সংসারটা কেমন খাপছাড়া হয়ে গেল শুধুমাত্র একটি মানুষের জন্য। আর এই মানুষটাকেই এ বাড়িতে শ্রদ্ধা করত ও সবচেয়ে বেশি।
-তোমায় আর একটা লুচি দিই? কথা বলার জন্যই কথাটা বলে উঠল মাম। যদিও দেখছে অভীকের প্লেটের খাবার প্রায় সরেইনি।
কথা বলেনা অভীক, দু’দিকে ঘাড় নাড়ে। একটা বড় শ্বাস বেরিয়ে আসে ওর বুক থেকে। উল্টোদিকে বসে থাকা অভিলাষার গায়ে এসে লাগে কিনা কে জানে আর চেপে থাকতে পারে না ও। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সদ্য কলেজ পাশ করা মেয়েটা।
মামের রাগ হয়,খুব রাগ হয়প। নিজের হাতে একটু একটু দশ বছর ধরে সাজিয়েছে ও এই সংসার। আর আজ শুধুমাত্র একজনের সিদ্ধান্তের জন্য সব তছনছ হয়ে যেতে পারে না। ইচ্ছে হয় ছুটে গিয়ে কাল থেকে ঘর বন্ধ করে বসে থাকা ওই ভন্ড লোকটাকে অপমানে জর্জরিত করে , চিৎকার করে বলে ওঠে,কেন কেন কেন?
কিন্তু মাম পারে না। কী এক অসম্ভব শক্তি ওর পা আটকে ধরে রাখে, কিছুতেই নড়তে পারে না মাম। কিছুতেই না।
কোনোমতে সামান্য খেয়েই উঠে পড়ে অভীক। মামের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বলে ওঠে,সে কোথায়?
মাম বুঝতে পারে অভীক কার কথা বলছে। সে উলটো দিকের ঘরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে,এখনো ঘরে। কাল থেকে কী করছে কে জানে?
কথাটা বলেই মাম বুঝতে পারে কাল দুপুর পর্যন্ত যে মানুষটাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করত ও, আর তার কণামাত্র অবশিষ্ট নেই। উলটে ওই লোকটার কথা মনে হতেই রাগে সারা শরীর জ্বলতে লাগল ওর। ব্যাপারটা মাথার থেকে বের করে ফেলার জন্যই ও অভিলাষার দিকে তাকিয়ে বলল, কলেজ যাবি না?
বৌদির দিকে জলভরা চোখে তাকাল সে, তারপর ধীরে ধীরে বলল, কলেজ কেন বৌদি এ বাড়ি থেকে বের হওয়ার উপায় রেখেছে লোকটা? আমাদের আর মরা ছাড়া কোনো গতি নেই।
মামও ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে এবার। সত্যি ওর এই সোনার সংসারে এমন ঘটনা ঘটবে এটা ভাবতেই পারছে না ও। কী ভাবে এই লজ্জা ঢাকবে মাম। কীভাবে সকলের দিকে তাকাবে? আদৌ কি কোনোদিন বেরোতে পারবে এ বাড়ি থেকে? নানা প্রশ্ন মাথার ভেতর গিজগিজ করতে থাকে মামের। কবে ওরা এই লজ্জা থেকে নিস্তার পাবে জানা নেই ওদের কারোরই।
(তিন)
আজ তিনদিন ধরে ঘুমের ওষুধেও কোনো কাজ হচ্ছে না। সেদিনই অভীকই ঘুমের ওষুধ দিতে বারণ করেছিল কিন্তু এখন নিজেই দিচ্ছে বাধ্য হয়ে। অভীকের মা আজ পাঁচবছর হল অসুস্থ। বেড রিডেন। ডাক্তার বলেছেন যত্নে রাখতে, উত্তেজনা একেবারেই নয়। দু দুটো স্ট্রোকে বাম দিকটা অসাড়। তবে কথা বলতেন ওই যতটুকু বলা দরকার। ক’দিন ধরে তাও বন্ধ।
না, সেভাবে রিয়্যাক্ট করেননি তিনি। শুধু সারাদিন ফ্যালফ্যাল করে মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে আছেন গত তিনদিন। ঘুম ,খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ।
দুপুর বেলা ধীর পায়ে মায়ের ঘরে এসে দাঁড়ায় অভীক। জানালা বন্ধ। ঘর জুড়ে ওষুধের গন্ধ, ফিনাইলেরও। মাম যথাসম্ভব পরিষ্কার রাখে ঘরটা, রুগীর ঘর মনেই হয় না। তবু ঘরে ঢুকলেই একটা অদ্ভুত নৈরাশ্য চেপে বসে। ঘরে ঢুকেই নাক কুঁচকে ফেলে অভীক।গা গুলিয়ে ওঠে ওর। তারপর হঠাৎই লক্ষ্য করে মা কি ওর দিকেই তাকিয়ে আছে? মা কি একটু হাসল? ঠোঁটের কোণে কেমন একটা হাসি লেগে আছে না? তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিল অভীক। জানালাগুলো খুলতে খুলতেই গলায় একটু জোড় এনে বলল, একটু উঠে বসবে? ধরব?
মা কিছুই বলে না। শুধু ইশারায় অভীককে কাছে ডাকে। হাত দিয়ে বিছানার ফাঁকা জায়গাটা দেখিয়ে বসতে বলে হয়ত, বুঝতে পারে অভীক।
মায়ের সারা শরীরে ওষুধের গন্ধ। বেড সোরও হয় মাঝেমাঝে। সারাদিনের আয়া রাখা আছে সেই সব পরিষ্কার করে। বসবে কি বসবে না ভেবেও বসেই পড়ে অভীক। মা হাসে, তারপর ওঁর হাত দিয়ে অভীকের গায়ে হাত বুলোতে থাকে সেই ছোটবেলার মতো।
কেমন যেন অচেনা লাগে মায়ের সেই স্পর্শ। সেই নরম, মোলায়েম হাতটা কেমন খসখসে হয়ে গিয়েছে। গা ঘিনঘিন করে ওঠে ওর। তবু মুখে হাসি এনে বলে, কিছু বলবে?
জড়ানো গলায় অভীকের মা বলে ওঠেন,খুব কষ্ট পাচ্ছিস না?
মায়ের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন করে অভীক -তোমার হচ্ছে না কষ্ট?
-হচ্ছে তো খুব কষ্ট হচ্ছে। তবে ওঁর চাইতে কম। বলার সময় মায়ের গলা বুজে আসে।
-কী বলছ তুমি এসব? এখনও তো সহানুভূতি? ওই লোকটা শেষ করে দিয়েছে আমাদের সাজানো সংসার, আর তাঁকে তুমি …
উত্তেজিত হয়ে পরে অভীক।
-আর আমি তাঁকে শেষ করিনি? মা এবার আর কাঁদে না।
অভীক অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। কী বলছে মা এসব? আরও কিছু শোনা কি বাকি থেকে গেছে?
অভীকের মা বলতে থাকে, সেই যখন তুই আর লিষা যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিস, সেইসময় থেকে একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছিলাম আমরা। তোদের নিয়েই তো ব্যস্ত ছিলাম, ওঁকে তো সময়ই দিইনি কোনোদিন।
-তাই কী মা? প্রায় চিৎকার করে ওঠে অভীক।
-আজ পাঁচ বছর হল আমি বিছানায়, কথাও ঠিক মতো বলতে পারি না। একটা পঙ্গু মানুষকে কতদিন সহ্য করা যায় বল তো বাবু? একটানে কথাগুলো বলে তিনি হাঁফাতে থাকেন।
-ও তুমি অসুস্থ বলেই যা ইচ্ছে করা যায়? এটা একটা কথা হল ! তবে তো…
অভীকের কথা শেষ হওয়ার আগেই ওর মা বলে ওঠে,এই যে তুই এ ঘরে এলি, খুব ভালো লাগছিল তোর? দেখছিলাম আনমনেই পকেটে হাত দিচ্ছিলি রুমালের খোঁজে। অসুখের গন্ধ ভালো লাগে না রে, আমি জানি। তোদেরও লাগে না।
কী বলবে বুঝতে পারে না অভীক। ভীষণ ছোট লাগে নিজেকে । মায়ের হাতে হাত রাখে, দু’চোখে জল। নরম গলায় ডাকে, মা।
-কাঁদিস না বাবু। সেই কবে থেকে তোদের বাবা অসুখের সঙ্গে সহবাস করছে, একাকীত্বের সঙ্গে সহবাস করছে। আর কত? ও যদি এবার নিজের মতো করে রেহাই পেতে চায়,পাক না, ক্ষতি কী? আমি তো আর ওঁকে কিছুই দিতে পারব না রে।
অবাক হয় অভীক,ভীষণ অবাক। এত মনের জোর কোথা থেকে পেল ওর মা? চিরকাল তো মাকে নরম মনের মানুষ বলেই জেনেছে ও। কিভাবে ভাবল এত কিছু?
মায়েরা যেমন সব বুঝতে পারে, তেমনি অভীকের মাও বুঝি পড়ে ফেলল ছেলের মনের কথা। হেসে বললেন, ভাবছিস কীভাবে পারলাম? পেলাম কোথা থেকে এত মনের জোর? অসুখটাই জীবনটাকে চিনতে শিখিয়ে দিল রে। শক্ত করে দিল।
মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরে অভীক। অস্ফুটে শুধু বলে ওঠে, তুমি হলে কী করতে? পারতে এমনভাবে হাত ছাড়তে?
-‘নাহ,পারতাম না। শেষ দিন অবধি সেবা করে যেতাম। কিন্তু মন? মন হয়ত অন্য কথা বলত? দাঁতে দাঁত চেপে মনের কথা অগ্রাহ্য করতাম। কিন্তু সবাই কি তা পারে?
-তাই বলে এভাবে সব ছেড়ে চলে যাবে সে? লোকে কী বলবে? কাতর গলায় বলে অভীক।
মা হেসে বলেন –লোক যাই বলুক না কেন তোর বাবার হয়ত এতেই খুব ভালো লাগবে। যা আর ওঁকে আটকাস না। যেখানে যেতে চান, যার সঙ্গে যেতে চান যেতে দে। জোর করে ধরে রাখলে শুধু শরীরটাকেই পারবি, মনকে বাঁধতে পারবি না।
সেই মুহূর্তে ঠিক কী বলবে বুঝতে পারে না অভীক। মায়ের ধৈর্য, সাহস দেখে অবাক হয় ও। খুব প্রণাম করতে ইচ্ছে করে। কতদিন প্রণাম করা হয় না মাকে, জড়িয়ে ধরা হয় না কতদিন! মায়ের দিকে তাকায় ও।
(চার)
চোখ বুজে আছেন তিনি। সারা মুখ জুড়ে প্রশান্তি। একটু আগেও সারা মুখের যে অসুখের ভাঙচুর লেগে ছিল কোন জাদুবলে তা মিলিয়ে গেল টেরই পেল না অভীক। মাকে আর বিরক্ত করে না অভীক, ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায়। যে চলে যাচ্ছে, তার যাওয়ার আয়োজন করতে হবে এবার। আর ভয় নেই, লজ্জা নেই কোনো।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে এসেছে বাইরে। দূরে দূরে উড়ে যাওয়া পাখিরা ঘরে ফেরার আয়োজন করছে। আর একটু পরই ঝাঁক বেঁধে ঘরে ফিরবে। অভীক মনে মনে ভাবে, ওর বাবাও এভাবেই উড়ে চলে যাবে কোথাও। উড়তে উড়তে একদিন তো ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করবেই, তাই না!
সেদিনেরই অপেক্ষা করবে ওরা। মায়ের চোখেও তো সে অপেক্ষাই দেখেছে সে। আর কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। ডুবে যাওয়া সূর্যের সঙ্গে সঙ্গেই ওরা একটা নতুন সকালের অপেক্ষা করবে, একটা সূর্যাস্তের ঝলমলে দিন তো আসবেই। তাই না?
(প্রকাশিত)







