পাপ – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে পাপ – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো –
পাপ – শাঁওলি দে :
(১)
মুখ জুড়ে অজস্র দাগ। পক্স কিনা বোঝা মুশকিল। চুল ছোট করে ছাঁটা, মাঝারি গড়ন, চট করে দেখলে বয়স বোঝা যায় না। একেবারেই বিশেষত্বহীন চেহারা। তবু কি যেন একটা আছে যার জন্য ওর দিকে একবার তাকালে আর একবার তাকাতেই হয়! কিছুতেই মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়া যায় না।
সায়ন এই রাস্তায় নতুন। প্রতিদিনের দশটা পাঁচটা ডিউটি ওর। এই চাকরিতে নতুনত্ত্ব নেই কিছুই; কিন্তু ওর ভালো লাগে। ভালো লাগে ছুটতে, ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে, আর ভালো লাগে রোজ রোজ প্রায় ঝুলতে ঝুলতে বাসে করে যাওয়া আসা। ইচ্ছে করলেই ট্যাক্সিতে যাতায়াত করতে পারে কিন্তু সে তা করে না। সহ্য করে প্রতিদিনের এই কষ্টটা। এই সুযোগে প্রচুর লোক দেখা হয়ে যায়। লোক দেখা বা বলা ভালো মানুষ চেনা সায়নের এক অন্যতম শখ। রোজ কত নতুন মুখ, নতুন অভিজ্ঞতা! সব কিছু সায়ন জমা করে রাখে ওর মনে; তারপর অবসরে তাদের নিয়ে নাড়াচাড়া করে, কাল্পনিক সংলাপ সাজায়। মনে মনে অনুমান করে নেয় তার বয়স, পেশা বা গন্তব্য… সেসব মেলে কিনা সায়ন তা জানে না। জানতেও কি চায় ? এই না জানাতেই যেন ওর আনন্দ। এতেই যেন ওর সব সুখ। ও নিজের মনের মত করে গড়ে তোলে ওর চারপাশ। কেউ এর নাগাল পায় না। চলন্ত বাসের মতই ওর মনও ছুটতে থাকে দূনির্বার গতিতে।
এই যাতায়াতের পথেই রোজ লোকটিকে দেখতে পায়। সায়নের পরের স্টপেজেই ওঠে। তবে কোথায় নামে তা সে জানে না। সায়ন লক্ষ্য করে লোকটা বাসে উঠেই এদিক ওদিক কী যেন খোঁজে! কী খোঁজে কাকেই বা খোঁজে ঠিকমতো ঠাহর করতে পারে না ও। তারপর হঠাৎ যেন সায়নকে দেখতে পেয়ে ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। এমনই মনে হয় সায়নের। মাঝরাস্তায় উঠলে বেশিরভাগ দিনই বসার জায়গা পাওয়া যায় না। কিন্তু সায়ন লক্ষ্য করেছে সিট পেলেও লোকটা বসে না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। খুব অবাক লাগে সায়নের, খুব। বুক জুড়ে অজানা একটা ভয়ও জাঁকিয়ে বসে ওর।
অফিসে পৌঁছে কাজের চাপে লোকটাকে ভুলে গেলেও বাড়ি ফিরে বা ফেরার সময় বার বার তার কথা মনে পড়ে যায় ওর। শুরু হয় শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তি! কিন্তু কিসের এই অস্বস্তি কিছুতেই বুঝতে পারে না ও। একবার ভাবে সকালেই বাসে ধরবে লোকটাকে। কিন্তু ধরে কিইবা জিজ্ঞেস করবে ? আদৌ কি জিজ্ঞেস করার কিছু আছে ? এর উত্তর জানা নেই সায়নের।
কিছুদিন থেকেই অফিসেই কানাঘুষা চলছিল। সায়নেরও কানে এসেছিল কথাটা। বিশ্ববাজারে অর্থনৈতিক মন্দা। তার আঁচ তো পড়বেই এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। সব জায়গায় ছাটাই শুরু হয়ে গেছে। যদিও সায়নদের অফিসে এখনও কারো নামে ‘শমন’ আসে নি, তবে শোনা যাচ্ছে উপরমহল থেকে কিছু নাম এসেছে। ভয় পাচ্ছে সবাই; এই বাজারে একবার কাজ গেলে পাওয়া মুশকিল, পরিবার নিয়ে পথে বসা ছাড়া আর উপায় থাকবে না। সায়নেরও চিন্তা হচ্ছে। চাকরীটা গেলে অসুস্থ বাবা মাকে নিয়ে পথে বসতে হবে। কিন্তু কিছু করারও নেই। এখন শুধুই অপেক্ষা, অপেক্ষা শেষ বিধানের।
এই ডামাডোলের মধ্যে বাসের লোকটির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সায়ন। বাসে সে উঠেছে কিনা তাও খেয়াল করেনি ক’দিন। তবে আজ বাসে উঠেই একেবারে সামনে লোকটিকে আবিষ্কার করল সে। লোকটির চাউনিটি বেশ অদ্ভুতই লাগল ওর। আজও ওর চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে সায়নের চোখদুটিতে। চোখে চোখ পড়তেই সারা শরীর শিরশির করে উঠল। গভীর কোনো দীঘির মতো চোখ দুটো। একবার সেই গভীরে ডুব দিলে সাঁতরে ওঠা মুশকিল। সায়ন সেই চোখের অতলে আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে লাগল।
তখন কতই বা বয়স হবে! সবে উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। রেজাল্ট বের হতে বাকি আছে আরও মাস দুয়েক। সেই সুযোগে মামাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সায়ন। বাবা পৌঁছে দিয়েই বাড়ি ফিরে এসেছিল। মামাতো ভাই বোনদের সাথে ক’দিন বেশ হইহুল্লোড়ে কাটছিল। পিকনিক, সিনেমা দেখা, দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেলেও ওদের আড্ডা ফুরাতো না। সেই সব আড্ডা আর জমায়েতের মাঝে ফুলের সাথে একটু বেশিই ঘনিষ্ঠতা হয়ে গিয়েছিল সায়নের। ফুল ওর বড়মামার বড় মেয়ে। সুন্দরী সমবয়সী ফুলকে বড্ড ভালো লাগত ওর। ফুলেরও হয়তো বা তেমনই, দলে থাকলেও ওরা মাঝে মধ্যেই আলাদা হয়ে যেত। হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দিত ঘন্টার পর ঘন্টা। এই বয়সটাই বোধহয় ভুল করার। নিষিদ্ধ সম্পর্কের পরিণতির কথা না ভেবেই ওরা এগিয়ে গিয়েছিল বহুদূর। নিঝুম দুপুরে চিলেকোঠার ফাঁকা ঘরে সেই প্রথমবার দু’জন দু’জনের ঠোঁটের উষ্ণতা অনুভব করেছিল। একবার, দু’বার, বারবার। সদ্য যুবক সায়ন ফুলের শরীর নিয়ে মেতে উঠেছিল আদিম খেলায়। ফুলের সম্পূর্ন আত্মসমর্পণ ওকে যেন একটু প্রশ্রয়ই দিয়ে ফেলেছিল। শ্রাবণের অবিরাম জলধারা যেমন মাটিকে সিক্ত করে তোলে ফুলও সিক্ত হয়ে উঠেছিল সায়নের তুমুল প্রেমে। বেশ কিছুদিন এই শরীরি লুকোচুরি খেলা চলেছিল ওদের। তারপর হঠাৎই মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে সায়নকে ফিরে আসতে হয়। তাড়াহুড়োয় ফুলকে একান্তে পাওয়াও হয়নি আর! বাড়ি ফিরে মায়ের হঠাৎ প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়া, হাসপাতাল – দৌঁড়ঝাপ সবকিছুতেই অনেকটাই সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। সেসময় আজকালের মতো একটু আধটু ফোন থাকলেও মোবাইলেরও চল ছিল না একেবারেই। মনের ভেতরে কোথাও ফুল ও ওর সাথে কাটানো সময়ের দাগ থেকে গেলেও দায় দায়িত্বর ভারে আস্তে আস্তে তাতে পলির আস্তরণ পড়ছিল ক্রমশ। এরকম একটা সময়েই সায়ন খবর পায়, ফুল আত্মহত্যা করেছে। হতবাক হওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না কিছুই। মামাবাড়িতে গিয়ে ওদের সামনে দাঁড়ানোর মতন বুকের পাটা ছিল না ওর। পরে শুনেছিল ফুল অন্ত:সত্ত্বা হয়েই নাকি গলায় দড়ি দেয়। অপরাধী ওর অংকের মাস্টারমশাই। অবাক হয়েছিল সায়ন; বুঝেছিল সবই। আর তাই মামাবাড়ির সাথেও আর যোগাযোগ রাখেনি কোনো। এড়িয়ে গেছে ওদের সযত্নে। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলি বছর চোখের নিমেষে।
বাসে উঠেই আজ আবার ওই সেই চোখ।সেই অদ্ভুত চাহনি। অস্থির লাগে সায়নের। এমনিতেই অফিসের ঝামেলা তার উপর এই লোকটি। গায়ে পড়ে কিছু জিজ্ঞেস করতেও বাধো বাধো ঠেকছিল। তবু আজ ও জেনেই নেবে যেমন করেই হোক। অফিস আওয়ার্সে বাসে এমনিতেও খুব ভিড়। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎই আর লোকটিকে খুঁজে পায় না। খুবই হতাশ লাগল। একরাশ বিরক্তি নিয়েই অফিসে পা দিল সায়ন। কথায় বলে, সকাল দেখলেই বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে ! আজও তাই; অফিসে যে ক’জনকে ছাটাই করা হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম সায়ন চৌধুরী। খবরটা শুনেই পাগলের মত অফিস থেকে বেরিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান’শূন্য হয়ে দৌঁড়াতে লাগল সায়ন। এখন কি করবে কোথায়ই বা যাবে কিছুই মাথায় আসছিল না তার। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন ও ক্লান্ত, বিপর্যস্ত ঠিক তখনই পেছন থেকে শুনতে পেল কে যেন ওর নাম ধরে ডাকছে ‘সায়ন,সায়ন দাঁড়াও।’
পেছন ফিরতেই বাসের সেই অদ্ভুত চাহনির লোকটিকে দেখতে পেল সায়ন। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওর কাছে।
-‘ভালো আছ সায়ন?’
লোকটির কথায় চমকেই ওঠে সায়ন।
কাঁপা গলায় জানতে চাইল, ‘আ আ আপনি আমার নাম জানলেন কি করে?’
লোকটির মুখে অদ্ভুত এক হাসি, বললেন, ‘শুধু নাম কেন তোমার সব কথাই আমি জানি।’
এই হেঁয়ালি অসহ্য লাগছিল সায়নের। অস্থির গলায় বলে উঠল, ‘কোন কথার কথা বলছেন আপনি? বলুন, বলুন আমাকে’
-‘বলব তো অবশ্যই। সেজন্যই তো আমার এই খোঁজ’ –
-‘কিসের খোঁজ? প্লিজ বলুন আমাকে তাড়াতাড়ি, আপনাকে কেন জানি’না আমি সহ্য করতে পারছি না’, প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল সায়ন।
-‘আশ্চর্য তো! অথচ আমারই তো তোমাকে সহ্য না করতে পারার কথা’, শান্ত গলায় বলল সে।
সায়ন আর পারল না। লোকটির হাত চেপে ধরে বলে উঠল, ‘প্লিজ আর হেঁয়ালি করবেন না। আজ আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেছে, এখন শুধু আপনার কথা শোনা বাকি, আর সেটা না শুনে আমি মরেও শান্তি পাব না।’
লোকটি হা হা করে হেসে উঠল, বলল, ‘তুমি তো আগেই শেষ হয়ে গেছ, আমি আর তোমায় কী করতে পারি?’
সায়ন অবাক চোখে তাকাল লোকটির দিকে। ওর জলভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলতে লাগল সেই কত দিন আগের প্রায় ভুলে যাওয়া কথা। শুনতে শুনতে সায়ন ভাবছিল কথাগুলো কি সে এতদিন সত্যি ভুলে ছিল নাকি শুধু ভুলে থাকার ভান করছিল।
ফুল যে সায়নের জন্যই আত্মহত্যা করেছিল একথা এতদিন মনে মনে জানলেও কাউকে কিছু কোনোদিন বলতে পারেনি ও। এই লজ্জার কথা ফুলও জানায়ওনি কাউকে। শুধু যাওয়ার আগে চিঠিতে লিখে গেছে আমার ‘মৃত্যুর জন্য দায়ী আমার মাস্টারমশাই’ . . .অথচ তিনি সব জেনে ফুলকে সাহায্যই করতে চেয়েছিলেন। তবু ফুল তাকে এতবড় শাস্তির মুখে কেন ঠেলে দিয়েছিল কে জানে! লোকটির কাছে এইসব কথা শুনতে শুনতে অদ্ভুত লাগছিল সায়নের। মাস্টারমশাইয়ের চাকরি চলে যাওয়া, জেলে কাটানো দিনযাপনের কথা শুনছিল সায়ন।
তারপর থেকেই পাগলের মতো এতদিন খুঁজে চলেছেন তিনি সায়নকে। শাস্তি দেবার জন্য ওকে খুঁজে পাওয়া জরুরি ছিল। এতদিনের এত অপেক্ষা আজ শেষ। সায়ন ভদ্রলোকের হাতের মুঠোয়, অথচ কি শাস্তি দেবে সায়নকে ও! একটা সম্পূর্ণ হেরে যাওয়া মানুষকে আর কি’ই বা; শাস্তি দেওয়া যায় ! যুদ্ধ জিতে যাওয়া গলায় মাস্টারমশাই বলে উঠলেন,
“যাও সায়ন। বেঁচে থাক মৃতদেহের মত, এটাই তোমার একমাত্র শাস্তি।
সায়নের মাথাটা ঝুঁকে পড়ে ক্রমশ। দূরে আকাশে তখন সূর্য ঢলে পড়ছে, চারপাশে অন্ধকার নেমে আসছে ধীরে ধীরে। এখন সায়নের জীবন জুড়েও অদ্ভুত অন্তহীন এক আঁধার – নি কা শ কা লো – আর সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে সায়ন বুঝতেই পারে না যে সে যা দেখছে, যা শুনছে তা কি সত্যি ? নাকি এতদিন ধরে ওরই পাপ ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে ? একেই কি তবে হ্যালুসিনেশন বলে ?







