চোরা সুখ – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে চোরা সুখ – শাঁওলি দে রচিত ছোটগল্পটি পাঠকদের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো –
চোরা সুখ – শাঁওলি দে :
(১)
-‘ খবর, কেমন আছিস ?’
গলাটা কেমন চেনা চেনা লাগছে ! চমকে গিয়ে পেছন ফিরলাম।
রূপক না ? উকিল পাড়ার মোড়ের বড় দশকর্মভান্ডারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চির পরিচিত ভঙ্গিতে। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, মুখে সেই পরিচিত হাসি। চিনতে পেরে আমিও অগত্যা হাসি মুখে এগিয়ে গেলাম। গলায় উচ্ছ্বাস ঝরিয়ে বললাম,’আরে রূপক ! কেমন আছিস ? কতদিন পর দেখা বল তো !’
এগিয়ে এসে আমার ঘাড়ে ডানহাতটা রেখে বলল, ‘হ্যাঁ রে, বহু দিন পর।ভালো লাগছে তোকে দেখে।কেমন আছিস তোরা ?’
তোরা শব্দটাতে কি একটু বেশিই জোর দিল রূপক ? অন্তত আমার তাই মনে হল। গলাটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললাম,’কবে ফিরলি দেশে ?’
-‘গত পরশু রে !’ আমার চোখে চোখ রেখে বলল রূপক।
-‘ও। তা আয় না একদিন বাড়িতে’, অনিচ্ছা সত্ত্বেও কথাটা বলেই ফেললাম।
-‘আমাকে তোর বাড়িতে ডাকছিস?এটা কিন্তু আমার দেশে ফেরার সেরা উপহার !’ কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠল ও। কিন্তু ওর এই রসিকতায় আমি কেন জানি না কিছুতেই হেসে উঠতে পারলাম না।বুকের ভেতরটা কেমন যেন করতে লাগল।চোখ নামিয়ে ফেললাম। ওর চোখের দিকে তাকাতে অস্বস্তি হচ্ছে খুব। অসহায় লাগছে। আমার অবস্থা টের পেয়েই হয়ত রূপক বলে উঠল,’আরে ইয়ার্কি করলাম, চাপ নিস না বন্ধু !’
-‘না, না সত্যি বলছি। আয় একদিন, জব্বর আড্ডা হবে।কলেজের বন্ধুরা একসঙ্গে আড্ডা দিলে আর কাউকে লাগে না’, হালকা স্বরে বললাম।
-‘আচ্ছা জো হুকুম মেরে দোস্ত’ বলেই হাতটা বাড়িয়ে দিল ও। অপ্রস্তুত হয়ে আমিও হাত বাড়ালাম। বহুদিন পর স্পর্শ পেলাম আমার একসময়ের প্রিয় বন্ধুর। কিন্তু নাহ, তেমন উষ্ণতা টের পেলাম না আগের মতো, বরং কেমন শীতল সে স্পর্শ-
ঠিক আমাদের সম্পর্কের মতোই।
রূপকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছে। বাড়ি ফিরেও ঠিকঠাক স্বস্তি পাচ্ছি না। জানালাটা খুলে ঘরের গুমোট ভাবটাকে কমাতে ব্যর্থ চেস্টা করলাম। মন চলে গিয়েছিল কত বছর আগের সেই সব দিনগুলিতে। যেন গতজন্মের কথা। আমি, রূপক, রবিন, সৌমেন, পরাগ, শিল্পী, পূজা, রীতা – বিরাট গ্রুপ। ছাতিম গাছের নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা, টেবিল বাজিয়ে গান, কলেজের ক্লাস বাঙ্ক করে সিনেমা কিম্বা নাটক। ভুলেই গিয়েছিলাম সেইসব দামাল দিনগুলোর কথা। আজ যদি রূপকের সঙ্গে দেখা না হত, হয়ত কোনদিনই এভাবে অতীত খুঁড়তে বসতাম না। নিজের অজান্তেই মাটি চাপা দিয়ে রেখেছিলাম স্মৃতিগুলোতে। সিগারেটটা হাতেই জ্বলতে জ্বলতে একসময় শেষ হতে লাগল, টের পেলাম আগুনের স্পর্শে। জানালা দিয়ে অর্ধেক সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে সদ্য পুড়ে যাওয়া আঙুলের দিকে তাকালাম। কিন্তু কই ? যতটা জ্বলার কথা ততটা তো জ্বলছে না বরং শরীরের অন্য কোথাও জ্বলুনি অনুভব করছি । বুঝতে পারছি আমার মনটা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।আমি জানি না কিভাবে আমার এই জ্বালা জুড়াব এখন।
দু’দিন পর অফিস থেকে ফিরতেই লেটার বক্সে কাঙ্ক্ষিত চিঠিটা পেলাম।কম দামি বাদামি রঙের খামটা সরকারি মোহরে বেশ দামি হয়ে উঠেছে। খুলতেই বেরিয়ে পড়ল চিঠিটা, ডিভোর্সের নোটিস পাঠিয়েছে পূজা।সাতদিনের মধ্যে জবাব না দিলে শমন আসবে। সাতদিন কেন আজই সময় থাকলে পালটা চিঠি পাঠিয়ে দিতাম। হ্যাঁ আমিও চাই ডিভোর্সটা এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। পূজার মতো মেয়ের সঙ্গে আর যাই হোক সংসার করা যায় না।
ইজি চেয়ারে নিজের ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলাম। খুব বিরক্ত লাগছে। পূজার আগে আমারই নোটিশটা পাঠিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল। তবেই সেই অহংকারী মেয়েটির সব দর্প চূর্ণ হত। কিন্তু হল না। আসলে রূপকের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। দশ বছর হয়ে গেল আমার জীবনে ওর কোনো অস্তিস্তই ছিল না। কিন্তু ওর হঠাৎ এই চলে আসা, আমার সঙ্গে দেখা হওয়া এসব কি সবই কাকতালীয় ? নাকি অন্য কিছু? কেন এসেছে ও এত বছর পর ? এই প্রশ্নের উত্তরই মনে মনে খুঁজে চলেছি আজকাল।
(২)
-‘কিরে কিছু শুনেছিস ?’ রবিনের গলায় বিষ্ময়।
-‘কিসের কথা বলছিস বল তো !’ ফাইলে চোখ রেখেই প্রশ্ন করলাম।
-‘ফোনে সব বলা যাবে না, অফিসের পর কখন মিট করবি বল !’রবিন বলল।
-‘আজ ? আজ হবে না রে, উকিলের কাছে যেতে হবে। পূজা নোটিশ পাঠিয়েছে সাতদিন সময় দিয়ে।
আমার কথাটা শেষ না হতেই রবিন বলে উঠল,’আরে কথাটা শোনা জরুরি, তোরই ডিভোর্স পেতে সুবিধে হবে।’
-‘মানে ?’ কিছুই না বুঝতে পেরে বলে উঠলাম।
রবিন বলল,’শোন আজ সন্ধ্যে ছ’টায় পিসি শর্মা মোড়ের সমবায়িকার সামনে দাঁড়াবি কেমন ! এখন ছাড়ছি।’
আমি কিছুই বলার সুযোগ পেলাম না। রবিনের এই এক দোষ, নিজে যা ভালো বুঝবে করবে কারো কিছু শুনবে না। সাতটার মধ্যে উকিলের কাছে আজ যেতেই হবে, উনি সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে যাবেন। পিসি শর্মা মোড় থেকে উকিলের চেম্বার যেতে আধ ঘন্টা তো লাগবেই। রবিনের সঙ্গে কথা বলে সাড়ে ছ’টায় বেরিয়ে যেতে হবে।মনে মনে একটা সময় সারণী ঠিক করে আবার ফাইলে ডুব দিলাম। এই অফিসের কাজই একমাত্র পারে আমার সমস্ত ব্যর্থতা, গ্লানি দূর করে দিতে।
ছ’টার মধ্যেই পিসি শর্মা মোড়ে পৌঁছে গেলাম।রবিন আর সৌমেন দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। কলেজের পর এই দুই বন্ধুর সঙ্গেই আমার যোগাযোগ রয়ে গেছে। অবশ্য বন্ধুর সংখ্যা আসলে তিন। অন্যজনের সঙ্গে এই মুহূর্তে আমার ডিভোর্সের মামলা চলছে।আমাকে দেখেই হাত নাড়ল সৌমেন।রাস্তা পেরিয়ে ওদের কাছে যেতেই শশব্যস্ত হয়ে বলে উঠলাম,’যা বলার তাড়াতাড়ি বল, সাড়ে ছ’টার মধ্যেই বেরিয়ে যাব।’
সৌমেন বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ জানি, চল ওই মিস্টির দোকানটায় গিয়ে বসি।’
-‘আরে এখানেই বল না’,গলার স্বরে বিরক্তি এনে বললাম।
-‘আয় তো’, বলেই আমাকে প্রায় টানতে টানতে উলটো দিকের মিস্টির দোকানে নিয়ে উঠল।
-‘তিনটে চা আর সিঙ্গাড়া, রবিন অর্ডার দিল।
আমার ওসবে মন নেই। অধৈর্য্য হয়ে বললাম,’কী বলবি বল না। এত হেঁয়ালি করছিস কেন ?’
-‘আরে বলব বলব,ধৈর্য্য হারাচ্ছিস কেন ? বলার জন্যই তো এলাম’, রবিন বলে উঠল।
লক্ষ্য করছিলাম রবিন আর সৌমেন দুজন দুজনের দিকে তাকাচ্ছে বার বার। ব্যাপার কী কিছুই বুঝতে পারছি না। ইতিমধ্যে চা-সিঙ্গাড়াও দিয়ে গিয়েছে টেবিলে। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে রবিন বলে উঠল,’রূপক এসেছে বুঝলি।’
প্লেট থেকে সিঙ্গাড়া তুলে বিরাট একটা কামড় বসালাম। আমার নির্লিপ্ততা দেখে ওরা স্বভাবতই খুব অবাক হল। সৌমেন বলল, ‘কিরে কথাটা শুনলি ?’
চায়ে চুমুক দিয়ে ধীরে ধীরে বললাম ,’জানি’।
-‘জানিস ? কই বলিসনি তো ?’ সৌমেন প্রায় চিৎকার করে উঠল।
-‘ভুলে গিয়েছি,’ সহজ গলায় বললাম, সেদিন উকিল পাড়ার মোড়ের একটা দোকানে হঠাৎই দেখা।বলল যে দু’চারদিন হল এসেছে।
-‘তাই নাকি ! কেন এসেছে কিছু বলেছে?’ সৌমেন জানতে চাইল।
-‘নাহ !’ আমি ওদের দু’জনের দিকেই তাকিয়ে বললাম।
রবিন হাসল, সৌমেনও। ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাড়ে ছ’টা বেজে গিয়েছে, এখনই বেরোতে না পারলে সময়মতো পৌঁছানো যাবে না। তলানিতে লেগে থাকা ঠান্ডা চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বললাম, ‘তোদের কথা শেষ, আমি এবার উঠব।’
-‘ও এসেছে তো জানিস, আসার কারণটাও জানিস নিশ্চয়ই’, কেটে কেটে সৌমেন কথাগুলো বলল।
-‘ওর নিজের দেশ, যেখানে ওর বাড়ি ঘর আত্মীয় পরিজন সব আছে সেখানে ও আসবে এটাই তো স্বাভাবিক’, বেশ রেগেই কথাগুলো বললাম। রূপকের থেকেও এখন আমার পূজার থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি বলেই মনে হল।
-‘আজ্ঞে না স্যর, কিছুই জানো না দেখছি’, বলে বিশ্রি করে হেসে উঠল সৌমেন।
রবিন বলল,’ওর এখানে আসার কারণ পূজা, বুঝলি গাধা !’
উত্তেজিত হলে রবিন নানা রকমের পশুর নাম উচ্চারণ করে।
-‘ছাগল, খুব তো যাওয়ার তাড়া ছিল এবার যা-’
ভিতরে ভিতরে কী ভীষন চমকে গিয়েছি সেটা প্রকাশ না করে বোকা বোকা মুখ করে বললাম,’কেন রে পূজার সঙ্গে এতবছর পর ওর কী?’
-‘কিছুই যেন বুঝছিস না গরু ? আরে এই জন্যই তো পূজা ডিভোর্সটা চাইছে, যাতে রূপকের সঙ্গে আমেরিকায় . . .শুনলাম ভিসার জন্যও অ্যাপ্লাই করেছে !’
সেই মুহূর্তে কী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। সামান্য হেসে আমার দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বললাম,’যেখানে খুশি যাক,আমার কী ? ছাড় তো!’
আমার মুখ থেকে এমন কথা বোধহয় আশা করেনি কেউই।বেশ মজাই লাগল। পকেট থেকে টাকা বের করে বিল মেটালাম তারপর ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম,’আজ উঠি রে, পরে কথা হবে। এরপর ওদের একটাও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে গেলাম।
(৩)
এলোমেলো হাঁটছি। প্রচুর লোকজন এদিকে অথচ আমার মতো একা বুঝি কেউ নেই। কোথায় কোন দিকে যাব বুঝে উঠতে পারছি না। যে খবরটা এইমাত্র পেলাম তাতে তো আমার মন খারাপ হওয়ার কিছু নেই। আমি তো থাকতেই চাই না পূজার সঙ্গে। তবে এমন লাগছে কেন ? হাঁটতে হাঁটতে নতুন ব্রীজটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। একটা সিগারেট ধরিয়ে ব্রীজের রেলিংটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।শিরশির করে হাওয়া বইছে। নিচের দিকটায় জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক প্রেমিকা বসে আছে। ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমার মুখে একটা নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল হঠাৎ। রূপক আমার একসময়ের প্রিয় বন্ধু কখন যে পরম শত্রু হয়ে উঠেছে নিজেই টের পাইনি। ওর জন্য স্কুল কলেজে কোনদিন প্রথম হতে পারিনি, এমনকি খেলাধূলোতেও নয়। আমার জন্য সবসময় দ্বিতীয় স্থান। তাই তো পূজার সঙ্গে ওর প্রেম পর্ব চলাকালীন নানা কৌশলে পূজাকে আমার দিকে টেনে এনেছি। মিথ্যে রটিয়েছি রূপকের নামে আর সহানুভূতি দেখিয়ে নিজে কাছে এসেছি পূজার।
ওর চোখের সামনে বিয়ে করেছি পূজাকে। এই একটা ব্যাপারে অন্তত ওকে জিততে দিইনি।বিয়ের রাতে যখন পূজাকে সিঁদুর পরাচ্ছিলাম রূপকের চোখে হার দেখেছি। জীবনের যুদ্ধে জিততে দিইনি ওকে আমি।বার বার ওর চোখে আমি সেই হারটাই দেখতে চাই। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বের করে উকিলের নম্বরটা ডায়াল করলাম। যে করে হোক ডিভোর্সটা আটকাতে হবে।পূজাকে আমি চাইনা ঠিকই কিন্তু রূপককেও ওকে পেতে দেব না এই আমার পণ।
জলন্ত সিগারেটটা করলা নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম, ঠিক এইভাবেই রূপকের জীবন থেকে পূজাকে ছুঁড়ে ফেলে দেব ঠিক আগেরবারের মতো। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা চোরা সুখের স্রোত বয়ে গেল। অনেক অনেক দিন পর আবার সেই রকম অনুভূতি যা একসময় অনুভব করতাম। রূপককে পরাজিত দেখার যে আনন্দ তা দেখার জন্য আমাকে যত দূর যেতে হবে যাব। নিজের মনেই হেসে উঠলাম আমি তারপর দু’পাশে দুটো হাত ছড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম।
ভীষন সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে আমার, ঠিক আগের দিনগুলোর মতোই।
প্রকাশিত নন্দন পত্রিকা







