বোধনে কি সত্যি সত্যিই দেবীর ঘুম ভাঙে? – শাঁওলি দে
EKTUKROAKASH.IN ওয়েবসাইটে বোধনে কি সত্যি সত্যিই দেবীর ঘুম ভাঙে? – শাঁওলি দে -র কলমে –

বোধনে কি সত্যি সত্যিই দেবীর ঘুম ভাঙে? – শাঁওলি দে :
সেই কোন ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন, শুরু হয়েছিল শরতকালে দুর্গা পুজা-‘সেই ট্র্যাডিশন আজও চলিতেছে।’
বোধন তো হল, কিন্তু অকাল কেন? এই কাহিনি অনেকেরই জানা। ত্রেতাযুগের আগে বসন্ত কালে দেবী দুর্গার আরাধনা করা হত। রাজা সুরথ সেই পুজার প্রথম আয়োজন করেন। এই পুজাই বাসন্তী পুজা নামে পরিচিত। বাসন্তী তো দেবী দুর্গারই আরেক রূপ।
কিন্তু রামচন্দ্র শরতকালে দেবী দুর্গার বোধন করেন, ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন তাঁকে। রাবনকে বধ করার জন্য এটাই ছিল তাঁর প্রথম অস্ত্র, উপাসনা। অশুভ শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য শুভ শক্তির আরাধনা। সেটা ছিল শরতকাল। পুরাণমতে শরতকাল দক্ষিণায়নের সময়, এই সময় দেবতা ঘুমিয়ে থাকেন অথবা বলা ভালো এই সময় পুজার অন্য উপযুক্ত সময় নয়। তাই ব্রহ্মার কথামতো রামচন্দ্র দেবীর আশির্বাদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেবীর বোধন করেন। তাই এই বোধন অকাল।
বোধন তো হয়, কিন্তু সতিকারের ঘুম ভাঙে কি? কলিযুগের এই শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এই কথা খুব মনে হয়। তবে কি আবারও অন্যকোনো রূপে অন্যকোনো অবতারের আগমন ঘটতে চলেছে?
একটা দুঃসহ পরিস্থিতি চলছে চারপাশে। মানুষ আজ যতটা আধুনিক ততটাই যেন ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারীদের প্রতি অসম্মান, অপমান আর লাঞ্চনা। সেই কোন আদিমকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হল না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট খুব ভাইরাল হয়। সেগুলোর স্ক্রিণশট তুলে তুলে লোকজন সেয়ার করে, হাসির ইমোজিতে ভরে যায় সেইসব পোস্ট। খেয়াল করে দেখবেন সেইসব পোস্টের বেশিরভাগই নারীদের নিয়ে মজা করে লেখা, স্ত্রীকে নিয়ে অসম্মানজনক উক্তি। ভাবতে অবাক লাগে এগুলোর কোনো প্রতিবাদ সেভাবে হয় না, বহু মহিলারাও রীতিমতো উপভোগ করেন এইসমস্ত পোস্ট।
সুনিতা উইলিয়াস মহাকাশে গেলেন, বিরাট কীর্তি স্থাপন করে ফিরে এলেন স্বমহিমায়, খোঁজ নিয়ে দেখুন ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতবর্ষের কোনো এক রাজ্যের এক অখ্যাত গ্রামে কিম্বা বড় কোনো শহরে কোনো এক নাবালিকার যোনী রক্তাক্ত করে দিয়ে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়েছে কেউ।
প্রেম করে বিয়ে করে চারচাকা না পাওয়ার কারণে এই তো সেদিনও জ্বালিয়ে মারল নিজের স্ত্রীকে তাঁর ছয় বছরের পুরোনো প্রেমিক স্বামী! যুগে যুগে কি এভাবেই ভালোবাসা উবে যায় তুচ্ছ কারণে?
পাশের বাড়ির কাকুর কাছে পড়তে যেত সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী। কিছুদিন পর থেকেই চুপচাপ হয়ে যায় সে, কিছুতেই যেত চাইত না কাকুর বাড়িতে। অনেকবার জিজ্ঞেস করায় জানতে পারা গেল পড়ানোর সময় আদর করে সেই কাকু, আর তাতে খুব ব্যথা পায় সে।
রাজু আর মলির সুখের সংসার। মলি প্রেগনেন্ট হলে বাড়ির সবাই খুব খুশি। তবু কিছুদিন পর রাজু জোর করে নার্সিংহোমে নিয়ে যায় গর্ভপাত করানোর জন্য, কারণ রাজু বেআইনিভাবে জানতে পেরেছে মলির গর্ভে রয়েছে কন্যাভ্রূণ!
এমন যে আরও কত ঘটনা; বিশ্বাস করে প্রেমিকের সঙ্গে তার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল রিম্পা, নিদারুণ দক্ষতায় নিজেদের অন্তরঙ্গ দৃশ্য তুলে নিয়েছে তার প্রেমিক গোপনে লুকিয়ে রাখা ক্যামেরায়।
এসব বাদ দিয়েও শুধুমাত্র যদি ধর্ষণের কথা ধরি, তাতে আমাদের রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। পরিসংখ্যান বলে, আমাদের দেশে প্রতি ঘন্টায় ধর্ষিত হন চারজন নারী (ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো), এর মধ্যে তিনজনের ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত পূর্বপরিচিত। প্রতিদিন গড়ে ৮৬টি ধর্ষণের মামলা করা হয় তার মধ্যে আবার ৫২টি কেসে নির্যাতিতা ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। গা কাঁটা দিয়ে ওঠে এসব শুনলে।
ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন আসলে নিজের পৌরুষত্বের আস্ফালন, ‘তথাকথিত’ দূর্বলের ওপর নিজের শক্তি কিম্বা ক্ষমতার প্রদর্শন। তবে শুধুমাত্র শারীরিকভাবে নিপীড়নকেই যে আমরা ধর্ষণ বলব তা তো নয়, নারীরা নির্যাতিত, অপমানিত কিম্বা লাঞ্চিত হন অনেকভাবেই। প্রতিদিন চলা ফেরার পথে ইচ্ছে করে শরীরের সঙ্গে শরীরকে ছুঁইয়ে দেওয়া, ভিড় বাসে কিম্বা ট্রেনে গোপন কোনো অংশ স্পর্শ করা তো আছেই। তবে শুধুমাত্র মেয়েরাই বুঝতে পারে কোন দৃষ্টি দিয়ে কে কীভাবে তাকালে বাড়ি ফিরে সেই মেয়েটিকে স্নান করে পরিস্কার করে নিতে হয়। এগুলোও কি ধর্ষণের সমার্থক নয়!
আজ আমরা অতি আধুনিক, মননে, শরীরে আর চালচলনে। নারীরা আজ কোনো অংশে কম নয়, কোনোদিনও ছিলও না। কিন্তু শুধুমাত্র শারীরিক কিছু বৈশিষ্ট্যর কারণে প্রতি মুহূর্তে এই লাঞ্ছনার স্পর্শ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ভাবতে অদ্ভুত লাগে যে বয়সে কোনো শিশুকে রূপকথার গল্পে বিভোর রাখার কথা সেই বয়সেই আমরা, কিছু ‘সচেতন’ বাবা ও মা তাদের ‘গুড টাচ’, ‘ব্যাড টাচ’ শেখাই, জানাই কখন কে শরীরের কোন কোন স্থান স্পর্শ করলে চিৎকার করে উঠতে হয়।
সেই পুরাণের কাল থেকে নারীদের ওপর এমন অত্যাচার এই উত্তর আধুনিক যুগেও একইভাবে কায়েম আছে তা কোনোভাবেই কি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়? যে দেশে গার্গী, মৈত্রেয়ী, লোপামুদ্রার মতো নারীরা জন্মেছেন, যে দেশের মানুষ অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা, মন্দোদরী এই পাঁচ সতীর নাম নিয়ে সকাল শুরু করেন, যে দেশে কালীকা শক্তি মাতৃকা শক্তিরূপে পূজিত, দুর্গা, লক্ষ্মী কিম্বা সরস্বতীর আরাধনায় ব্রতী আমরা সকলে সে দেশে কন্যারা, নারীরা এমনকি শিশুরাও সুরক্ষিত নয়। বিষয়টা কেমন পরস্পর বিরোধী হয়ে যায় না?
প্রতি বছর ঘটা করে দুর্গা মায়ের বোধন করি আমরা, পাড়ায় পাড়ায় নজরকাড়া মণ্ডপ, ঢাক ঢোল বাজিয়ে মায়ের আবাহন করি, অথচ ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে ‘ঠাকুর’ দেখতে যাওয়ার সময় কোনো না কোনো নারীর গোপনাঙ্গ ছুঁয়ে যায় এক ‘পুরুষের হাত’! অদ্ভুত না?
এ কেমন বোধন করি আমরা? আদৌ আমাদের বোধনে দেবীর ঘুম ভাঙে তো? নাকি আমাদের পাপের ঘড়া এতটাই পূর্ণ হয়ে গেছে যে বোধন তো করি পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ম মেনে অথচ মায়ের আর ঘুম ভাঙে না! ‘বিল্বপত্র পুষ্পাঞ্জলি’ দিয়ে আমরা চোখ বুজে কী চাই মায়ের কাছে? ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহি’, এইটুকুই শুধু চাওয়া?
‘অচিন্ত্যরূপচরিতে সর্ব্বশত্রু বিনাশিনী’ দেবী দুর্গার সামনে সবসময় আমাদের মাথা নিচু হয়ে আসে লজ্জায়। শত্রুদের একা হাতে দমন করেছেন এক নারী, অথচ লক্ষ লক্ষ নারী আজও হিংসা লালসার শিকার। আমাদের বোধবুদ্ধি, সচেতনতা ক্রমশ কমে কমে আসছে তাই তো কোনো ঘটনা শুনলে মনে মনে ঠিক ভাবি যাক আমাদের বাড়ির কারো তো হয়নি! তারপর সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া পোস্ট দিই, মোমবাতি নিয়ে মিছিল করি, দুই চারদিন অনশন-টনশন! অবস্থার পরিবর্তন আর কিছুতেই হয় না! ‘অবতাররূপী’ দূত এসে একদিন নিজের চোখ তুলে দেবীর আবাহনও করেন না, দেবীর প্রকৃত বোধনও হয় না। যদি হত, তবে কি অসম্মানিত হতে হত নারীদের?
দেবীপক্ষ শুরু হয়েছে সদ্যই। আবারও আমরা গেয়ে উঠব ‘জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণ ধারিণী অভয়াশক্তি বল প্রদায়নী তুমি জাগো…’ আবারও আমরা জোর হাত করে মায়ের উদ্দেশ্যে বলে উঠব, ‘দেহি সৌভাগ্যম আরোগ্যম দেহি মে পরমং সুখম’। হ্যাঁ, মা দেবেন সব, মুঠো ভরে দেবেন, আঁচল ভরে দেবেন। সেই সুযোগে একবার মায়ের কানে কানে বলে ওঠা যায় না, মা তোমার সত্যিকারের বোধন কবে হবে?
বিশ্বাস করি, তেমন দিন ঠিক একদিন আসবে, যেদিন নারী বলে কোনো শব্দ থাকবে না আলাদা করে, তার পরিচয় হবে শুধু মানুষ হিসেবে। কোনোভাবেই কোনো অসম্মানিত হতে হবে না তাদের, সেদিন ঠিক বুঝে যাব, মা এবারে সত্যি সত্যি জেগে উঠেছেন, আমাদের এ বোধন সেদিনই সার্থক হবে, তাই না?
প্রকাশিত উত্তরবঙ্গ সংবাদ ২৮/০৯/২০২৫





